বাণিজ্য সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মদ বিক্রিতে অনড় অন্টারিও সরকার

জুমু চৌধুরী

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রভাব এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে অন্টারিও প্রদেশের বাজারে।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনার প্রভাব এখনও স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে অন্টারিও প্রদেশের বাজারে। বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত মদ আবারও অন্টারিওর বাজারে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠলেও আপাতত সেই পথে হাঁটছে না প্রাদেশিক সরকার। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্য বিরোধের গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সরকারের বর্তমান অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ফোর্ড বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে অবস্থান করছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বিরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তাই তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে এমন একটি সমঝোতা প্রয়োজন যা উভয় দেশের স্বার্থকে সম্মান করবে এবং ভবিষ্যতে নতুন করে বিরোধের সম্ভাবনা কমিয়ে আনবে। তার মতে, বর্তমানে যে উত্তেজনা চলছে, তা কেবল শুল্ক বা বাণিজ্যিক নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এজন্যই বিরোধের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত অন্টারিও সরকার নিজেদের অবস্থান বজায় রাখতে চায়।

কয়েক মাস আগে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করলে অন্টারিও সরকার রাষ্ট্রীয় মদ বিক্রয় ব্যবস্থার তাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে সময় প্রাদেশিক সরকার এটিকে কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন মদ উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের জন্য অন্টারিওর বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কারণ অন্টারিওর রাষ্ট্রীয় মদ বিক্রয় নেটওয়ার্ক কানাডার অন্যতম বৃহৎ বাজার হিসেবে পরিচিত। ফলে এই পদক্ষেপ শুধু প্রতীকী নয়, অর্থনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বর্তমানে ব্যবসায়ী মহলের একাংশ মনে করছে, বাজারে প্রতিযোগিতা ও ভোক্তাদের পছন্দের কথা বিবেচনা করে মার্কিন মদ পুনরায় বিক্রির অনুমতি দেওয়া উচিত। তবে প্রাদেশিক সরকার এখনো সেই দাবিতে সাড়া দেয়নি।

ডগ ফোর্ড সতর্ক করে বলেছেন, চলমান বাণিজ্য বিরোধের কারণে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বহু প্রতিষ্ঠান সরাসরি এই বিরোধের প্রভাব অনুভব করছে। তিনি বলেন, সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে। পণ্য সরবরাহ, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং বাজারমূল্যের ক্ষেত্রেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফোর্ডের মতে, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এতটাই পরস্পরনির্ভরশীল যে দীর্ঘমেয়াদে বিরোধ বজায় থাকলে উভয় দেশই ক্ষতির মুখে পড়বে। এজন্য তিনি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন অন্টারিওর প্রিমিয়ার। সফরকালে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। যদিও নির্ধারিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে যায়, তবুও সামগ্রিক আলোচনা নিয়ে তিনি আশাবাদী। ফোর্ডের ভাষ্য অনুযায়ী, সীমান্তের উভয় পাশেই এখন বিরোধ নিরসনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা উভয় পক্ষকেই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করবে।

এদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ডগ ফোর্ডের জনপ্রিয়তায় কিছুটা পতনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সরকারি কাজে ব্যবহারের জন্য একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ তোলে যে করদাতাদের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। ব্যাপক সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত উড়োজাহাজটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে ফোর্ড এখনো মনে করেন, সে সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক ইস্যুর পাশাপাশি এই বিতর্কও তার জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে। তবে ফোর্ড প্রশাসন আশা করছে, অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়ন সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো আগামী দিনে জনসমর্থন পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনায় টরন্টোর জলবেষ্টিত নগর বিমানবন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ডগ ফোর্ড। কেন্দ্রীয় সরকার বিমানবন্দরটির সম্ভাব্য সম্প্রসারণ নিয়ে জনপরামর্শ কার্যক্রম শুরু করায় তিনি সেটিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকা টরন্টো মহানগরের জন্য কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিমানবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। শহরের জনসংখ্যা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে শুধুমাত্র দূরবর্তী বিমানবন্দরগুলোর ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফোর্ড মনে করেন, নগরবাসীর একটি বড় অংশ শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি বিমান যোগাযোগ সুবিধা চায়। তাই বিমানবন্দর সম্প্রসারণের প্রশ্নটি শুধু পরিবহন নয়, বরং নগর অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত।

মার্কিন মদ বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার মাধ্যমে ডগ ফোর্ড একদিকে যেমন কানাডার অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার বার্তা দিতে চাইছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবেও দৃঢ় অবস্থান প্রদর্শন করছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি বজায় রাখা কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য আলোচনার অগ্রগতির ওপর। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট যে, অন্টারিও সরকার আপাতত কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। ফলে মার্কিন মদ আবার অন্টারিওর বাজারে ফিরবে কি না, তার উত্তর এখন নির্ভর করছে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক টানাপোড়েনের ভবিষ্যৎ সমাধানের ওপর।

Related Articles

Back to top button