বিশ্বকাপের দায়িত্বে বাধা, সোমালিয়ার ক্রীড়া কর্মকর্তাকে টরন্টোতে আমন্ত্রণ

দিদার হোসেন

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরই নয়, এটি বিশ্বব্যাপী মেধা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও প্রতীক।

বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরই নয়, এটি বিশ্বব্যাপী মেধা, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতারও প্রতীক। সেই বিশ্বমঞ্চে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাওয়া যে কোনো ক্রীড়া কর্মকর্তার জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের ঠিক আগমুহূর্তে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন সোমালিয়ার ক্রীড়া কর্মকর্তা ওমর আরতান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম হয়েছে।

ঘটনার পর থেকেই বিশ্ব ফুটবল মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে একজন যোগ্য ও নির্বাচিত ক্রীড়া কর্মকর্তাকে কেন বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক আয়োজনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে? যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রকাশ করেনি, তবুও বিষয়টি ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই ওমর আরতানের প্রতি সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টো। শহরের মেয়র অলিভিয়া চাউ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে আরতানকে টরন্টোতে স্বাগত জানাতে তিনি প্রস্তুত। তার মতে, বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং সমান সুযোগের নীতিতে বিশ্বাসী একটি আন্তর্জাতিক নগরী হিসেবে টরন্টোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া উচিত। তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গেও আলোচনা করার ইচ্ছা রয়েছে তার। মেয়রের এই বক্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয়, বরং বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে গড়ে ওঠা সমতার মূল্যবোধের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

শুধু টরন্টো নয়, কানাডার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাও আরতানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড এবি বলেছেন, নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো একজন ক্রীড়া কর্মকর্তাকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। তার মতে, ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ম্যাচগুলোতে আরতানের দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকা উচিত। অন্যদিকে অন্টারিওর বিরোধী দলীয় নেত্রী মেরিট স্টাইলসও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে অর্জিত একটি অবস্থানকে সম্মান জানানো প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা ইতিবাচক বার্তা বহন করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন শুধু একজন ব্যক্তির জন্য নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ব্যবস্থায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত ও অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিয়মিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নথি ও তথ্য পর্যালোচনার পর তাকে প্রবেশের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়নি। তবে ঠিক কোন কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে। যদিও আরতানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবুও আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। কারণ বর্তমানে বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত সোমালিয়ার একমাত্র কর্মকর্তা তিনিই।

কানাডার বিভিন্ন নেতা আরতানের পক্ষে অবস্থান নিলেও বাস্তবতা হলো, কোনো মেয়র বা প্রাদেশিক সরকারের হাতে আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার দেওয়ার ক্ষমতা নেই। অভিবাসন ও সীমান্তসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। ফলে টরন্টো বা ভ্যাঙ্কুভার তাকে স্বাগত জানাতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংশ্লিষ্ট ফেডারেল কর্তৃপক্ষকেই। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাও একই অবস্থান জানিয়েছে। তাদের মতে, কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের প্রবেশসংক্রান্ত বিষয় সংশ্লিষ্ট স্বাগতিক দেশের আইন ও নীতিমালার ওপর নির্ভরশীল।

ঘটনার কেন্দ্রে থাকা ওমর আরতান অবশ্য পরিস্থিতিকে ইতিবাচকভাবেই দেখার চেষ্টা করছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাময়িক এই জটিলতা তার পেশাগত লক্ষ্যকে বদলে দিতে পারবে না। ভবিষ্যতের দায়িত্ব এবং নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত রাখছেন। তার এই মনোভাব অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং অসংখ্য বাধা অতিক্রম করার গল্প জড়িয়ে থাকে।

ওমর আরতানকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক কেবল একটি ক্রীড়া সংবাদ নয়। এটি আন্তর্জাতিক যাতায়াত, অভিবাসন নীতি, বৈশ্বিক অংশগ্রহণ এবং মেধার স্বীকৃতি এসব বিষয়ক বৃহত্তর আলোচনারও অংশ। বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক আয়োজনের মূল দর্শন হলো বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি এবং মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। সেই প্রেক্ষাপটে একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হারালে তা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবল অঙ্গনের নজর রয়েছে এই ঘটনার পরবর্তী অগ্রগতির দিকে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সোমালিয়া থেকে উঠে আসা এক ক্রীড়া কর্মকর্তা ওমর আরতান, যার গল্প এখন শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের নয়, বরং বৈশ্বিক সুযোগ ও সমতার প্রশ্নেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Related Articles

Back to top button