চাকরি খোঁজার নতুন উন্মাদনা, আবেদনপত্রের চাপে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো

মাসুদ করিম

কানাডার চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক চাকরিপ্রার্থী এখন একটি নয়, বরং একই দিনে শত শত প্রতিষ্ঠানে আবেদন পাঠাচ্ছেন।

কানাডার চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক চাকরিপ্রার্থী এখন একটি নয়, বরং একই দিনে শত শত প্রতিষ্ঠানে আবেদন পাঠাচ্ছেন। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুল সংখ্যক চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংখ্যার এই প্রতিযোগিতা শেষ পর্যন্ত চাকরিপ্রার্থীদের জন্য সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনছে না। দেশটির শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক চাপ তৈরি করেছে। ফলে অনেকেই এখন লক্ষ্যভিত্তিক আবেদন করার পরিবর্তে যত বেশি সম্ভব প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোর কৌশল বেছে নিচ্ছেন।

বিশেষ করে নতুন স্নাতক ও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে দীর্ঘদিন ধরে কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়ছেন। এর ফলে তারা নিজেদের দক্ষতা বা আগ্রহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকা পদেও আবেদন করছেন। চাকরি খোঁজার বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন দেখা যাচ্ছে, একজন প্রার্থী একই সঙ্গে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিপণন নির্বাহী, গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর কিংবা প্রযুক্তি খাতের চাকরিতেও আবেদন করছেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, কর্মপরিবেশ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা সম্পর্কে কোনো গবেষণা করছেন না। শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা মূলত চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি মরিয়া প্রচেষ্টা। তবে এতে আবেদনকারীরা নিজেদের শক্তি ও যোগ্যতাকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ হারাচ্ছেন।

কয়েক বছর আগেও একটি চাকরির জন্য আবেদন করতে একজন প্রার্থীকে জীবনবৃত্তান্ত সংশোধন, কাভার লেটার তৈরি এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী আবেদনপত্র প্রস্তুত করতে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে হতো। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় আবেদন সফটওয়্যার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কারণে একই তথ্য ব্যবহার করে খুব অল্প সময়ে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে আবেদন পাঠানো সম্ভব হচ্ছে। চাকরি খোঁজার বিভিন্ন ওয়েবসাইটে এমন সুবিধা যুক্ত হয়েছে, যেখানে একটি ক্লিকেই একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন পাঠানো যায়। ফলে আবেদনকারীদের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও আবেদনগুলোর মান ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। প্রযুক্তি আবেদন প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে অনেক প্রার্থী আবেদন করার আগে নিজেদের যোগ্যতা ও পদের চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন না।

অন্যদিকে নিয়োগদাতারাও এই পরিস্থিতিতে নতুন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বর্তমানে একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আবেদন জমা পড়ছে। কিন্তু এসব আবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বড় একটি অংশের প্রার্থীর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদের কোনো মিল নেই। ফলে মানবসম্পদ বিভাগকে বিপুল সংখ্যক আবেদন যাচাই করতে অতিরিক্ত সময় ও সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন প্রাথমিক বাছাইয়ের জন্য স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ফিল্টারিং ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। একজন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক বলেন, “আমরা প্রতিদিন শত শত আবেদন পাচ্ছি। কিন্তু এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন এমন প্রার্থীদের কাছ থেকে আসে, যাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের খুঁজে বের করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।”

নিয়োগদাতাদের আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো আবেদনপত্রগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান মিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর টুল ব্যবহার করে তৈরি জীবনবৃত্তান্ত ও কাভার লেটারের কারণে অনেক আবেদন এখন প্রায় একই রকম দেখাচ্ছে। ফলে প্রার্থীর ব্যক্তিত্ব, সৃজনশীলতা এবং পেশাগত বৈশিষ্ট্যের স্বতন্ত্র প্রকাশ কমে যাচ্ছে। নিয়োগকারীরা বলছেন, অনেক আবেদনপত্রে ভাষা, উপস্থাপন এবং দক্ষতার বিবরণ এতটাই একরকম যে প্রকৃত যোগ্যতা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। চাকরিপ্রার্থীরা যখন প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব অর্জনগুলো আবেদনপত্রে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এর ফলে আবেদনকারীরা নিজেদের বিশেষত্ব তুলে ধরার সুযোগ হারান।

সাম্প্রতিক শ্রমবাজার গবেষণায় দেখা গেছে, কানাডার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলকভাবে আশাবাদী হলেও কর্মীদের মধ্যে সেই আস্থা অনেক কম। মুদ্রাস্ফীতি, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কর্মক্ষেত্রের দ্রুত রূপান্তর অনেক কর্মী ও চাকরিপ্রার্থীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এই উদ্বেগের কারণেই অনেকের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যত বেশি আবেদন করা যাবে তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা কেবল আবেদনের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না।

কর্মসংস্থান পরামর্শকরা বলছেন, নির্বিচারে শত শত আবেদন পাঠানোর চেয়ে সঠিক চাকরির জন্য পরিকল্পিতভাবে আবেদন করাই বেশি ফলপ্রসূ। একটি প্রতিষ্ঠানের কাজ, সংস্কৃতি এবং চাহিদা সম্পর্কে গবেষণা করে সেই অনুযায়ী জীবনবৃত্তান্ত ও কাভার লেটার প্রস্তুত করলে সাক্ষাৎকার পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাদের মতে, আবেদনপত্রে নিজের অভিজ্ঞতা, অর্জন এবং দক্ষতাকে প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা জরুরি। একই সঙ্গে পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নির্দিষ্ট খাতে বিশেষায়িত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তি চাকরি খোঁজার প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করেছে, কিন্তু এটি কখনো ব্যক্তিগত প্রস্তুতি, দক্ষতা এবং পেশাগত যোগ্যতার বিকল্প হতে পারে না। শেষ পর্যন্ত নিয়োগদাতারা এমন কর্মীই খোঁজেন, যিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য বাস্তব মূল্য তৈরি করতে পারবেন এবং যার মধ্যে আন্তরিকতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা ও স্বতন্ত্র চিন্তার পরিচয় রয়েছে। তাই চাকরির বাজারে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতার মধ্যেও শুধুমাত্র সংখ্যার পেছনে না ছুটে মানসম্মত প্রস্তুতি, লক্ষ্যভিত্তিক আবেদন এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, শত শত আবেদন পাঠানোর চেয়ে সঠিক জায়গায় একটি শক্তিশালী আবেদনই অনেক সময় সফলতার দরজা খুলে দিতে পারে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button