
আগামী কয়েক দশকের বিদ্যুৎ চাহিদা নিশ্চিত করা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার। নতুন জাতীয় পারমাণবিক কৌশলের আওতায় দেশজুড়ে একাধিক নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, ইউরেনিয়াম রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং কানাডার নিজস্ব প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রকাশিত কৌশলপত্র অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০টি নতুন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কানাডায় উদ্ভাবিত ক্যান্ডু প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সরকারের মতে, দ্রুত বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ চাহিদা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারমাণবিক শক্তি ভবিষ্যতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য সমাধান হতে পারে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং শিল্প উৎপাদনের প্রসারের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কানাডাও এর ব্যতিক্রম নয়। দেশটির সরকারি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগামী কয়েক দশকে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে। বর্তমানে কানাডার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ আসে পারমাণবিক শক্তি থেকে, বিশেষ করে অন্টারিও প্রদেশে। তবে বিদ্যমান অবকাঠামো দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট হবে না বলে মনে করছে সরকার। সে কারণেই নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অন্তত দুটি বৃহৎ পারমাণবিক প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রকল্পকে পরিকল্পনা, অনুমোদন ও উন্নয়ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হবে।
কানাডার পারমাণবিক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে মূলত অন্টারিওকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। তবে নতুন কৌশলে প্রথমবারের মতো অন্টারিওর বাইরে অন্তত একটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভারসাম্য বাড়বে এবং জ্বালানি সরবরাহ আরও নিরাপদ হবে। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান ও শিল্প বিনিয়োগের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
বৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি কানাডা ছোট আকারের আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি বা স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারের ধারণা, প্রত্যন্ত অঞ্চল, খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ উত্তরাঞ্চল এবং দুর্গম এলাকায় এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেখানে প্রচলিত বিদ্যুৎ গ্রিড পৌঁছানো ব্যয়বহুল বা প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন, সেখানে ক্ষুদ্র চুল্লি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যতে এসএমআরপ্রযুক্তি শুধু কানাডার অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনই মেটাবে না, বরং এটি আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে।
পারমাণবিক শক্তি খাতে কানাডার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো ক্যান্ডু প্রযুক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে এই প্রযুক্তিনির্ভর চুল্লি সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার এখন সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা করছে। কৌশলপত্রে বলা হয়েছে, আগামী বছরগুলোতে একাধিক দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করার চেষ্টা চালানো হবে। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুধু প্রযুক্তি বিক্রির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে কয়েক দশকব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ, প্রকৌশল সহায়তা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা। ফলে এমন প্রকল্প অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি কূটনৈতিক সম্পর্কও শক্তিশালী করে।
পারমাণবিক শক্তি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ইউরেনিয়ামের বৈশ্বিক চাহিদাও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউক্রেন যুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে কানাডা নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। সরকারের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে একটি নির্ভরযোগ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। যদি বৈশ্বিক পারমাণবিক শিল্পের নতুন সম্প্রসারণ শুরু হয়, তাহলে কানাডার ইউরেনিয়াম খাত আগামী কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না। নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। সরকারি কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। যদিও অর্থায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা এখনও প্রকাশ করা হয়নি, তবে বিভিন্ন সরকারি তহবিল, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং অংশীদারিত্বমূলক অর্থায়নের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রকল্পগুলোর সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখার ওপর।
সরকারের ঘোষণার পর বিরোধী দলগুলো পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের বক্তব্য, অতীতে বহু বড় প্রকল্প ঘোষণার পর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে। বিরোধীদের মতে, নতুন কৌশল কতটা সফল হবে তা নির্ভর করবে বাস্তব অগ্রগতির ওপর। শুধু পরিকল্পনা প্রকাশ নয়, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রকল্পগুলোর নির্মাণ শুরু ও সম্পন্ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
কানাডার নতুন পারমাণবিক কৌশল শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নয়; এটি দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, শিল্পনীতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি প্রচেষ্টা। যদি পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে কানাডা একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক পারমাণবিক প্রযুক্তি ও ইউরেনিয়াম বাজারে আরও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। তবে পরিবেশগত উদ্বেগ, প্রকল্প ব্যয়, জনসমর্থন এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উচ্চাভিলাষী উদ্যোগের চূড়ান্ত সাফল্য।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



