
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন মাঠের লড়াই দর্শকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে, তখন মাঠের বাইরেও সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি চালাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। আন্তর্জাতিক এই ক্রীড়া আয়োজনকে কেন্দ্র করে টরন্টোর আকাশপথে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জনসমাগমপূর্ণ এলাকা, ফ্যান জোন এবং খেলা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির অংশ হিসেবে গত দুই সপ্তাহে একাধিক অননুমোদিত ড্রোন শনাক্ত করেছে পুলিশ। এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে ১৪ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা শুরুর পর থেকেই শহরের কেন্দ্রস্থল এবং বিভিন্ন বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট এলাকায় ড্রোন উড্ডয়নের ঘটনা নজরে আসে। বিশেষ করে দর্শকদের জন্য নির্ধারিত উৎসব এলাকা, বড় পর্দায় খেলা দেখার স্থান এবং গুরুত্বপূর্ণ সমাবেশস্থলের আশপাশে বেশ কয়েকটি ড্রোন উড়তে দেখা যায়। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, এসব ড্রোনের বেশিরভাগই অনুমতি ছাড়া পরিচালিত হচ্ছিল, যা নিরাপত্তা বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
সর্বশেষ ঘটনা ঘটে গত শনিবার। নিরাপত্তা দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা একটি ড্রোন আকাশে শনাক্ত করার পর দ্রুত এর অবস্থান নির্ণয় করেন। পরে ড্রোনটির পরিচালকের বিরুদ্ধে বেসামরিক বিমান চলাচল সংক্রান্ত বিধি ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়। এর ফলে চলতি মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু হওয়া অভিযানে দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪-তে।
নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ চলাকালে নির্ধারিত নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে ব্যক্তিগত ড্রোন উড্ডয়নের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। বিশেষ করে সেন্টেনিয়াল পার্ক এবং এর আশপাশের এলাকাকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা অঞ্চলের আওতায় রাখা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের অননুমোদিত উড্ডয়ন কঠোরভাবে দমন করা হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে তাদের হাতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে যার মাধ্যমে আকাশে উড়ন্ত ড্রোন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। শুধু ড্রোনের অবস্থান নয়, অনেক ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তির অবস্থানও নির্ধারণ করা যায়। ফলে নিরাপত্তা বাহিনীর নজর এড়িয়ে ড্রোন পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে সোমবার সন্ধ্যায় আরেকটি পৃথক ঘটনায় এক্সিবিশন এলাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে একটি ড্রোন আটক করা হয়। তদন্ত শেষে ড্রোনটির পরিচালকের বিরুদ্ধে বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এই ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, বরং হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, খেলাকে ঘিরে বিপুল সংখ্যক দেশি-বিদেশি দর্শক, পর্যটক এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। সে কারণেই স্থল ও আকাশ উভয় পথেই সমান গুরুত্ব দিয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ছোট আকারের ড্রোনও বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এসব ড্রোনের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ঘটার পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে ক্রীড়া আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বড় জনসমাগমে অনিয়ন্ত্রিত ড্রোন উড্ডয়ন আতঙ্ক এবং বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের নিরাপত্তা এখন শুধু মাঠ কিংবা স্টেডিয়ামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আকাশপথও সমান গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাই বিশ্বকাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত টরন্টোর আকাশে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে এবং নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিশ্বকাপের উৎসবমুখর পরিবেশে দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়োজক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। তাদের স্পষ্ট বার্তা নিরাপত্তা বিধি মেনে চললেই কেবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরের আনন্দ নির্বিঘ্নভাবে উপভোগ করা সম্ভব হবে।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



