
কানাডার সাধারণ মানুষ চলতি বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমার প্রত্যাশা করলেও মে মাসের অর্থনৈতিক চিত্র সেই আশাকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং বিমান ভ্রমণের ব্যয় বৃদ্ধির ফলে দেশটির মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমান মূল্যচাপ উদ্বেগের কারণ হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের রূপ নেবে না।
কানাডার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। এপ্রিল মাসে এই হার ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের শেষভাগের পর এটিই মূল্যস্ফীতির সর্বোচ্চ হার, যা দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন করে চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কানাডার বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবাখাতের ওপর। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের দৈনন্দিন খরচ আগের তুলনায় আরও বেড়েছে।
বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিগোচর হয়েছে। মে মাসে মুদি পণ্যের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টানা ১৬ মাস ধরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, অন্যান্য খাতে মূল্যবৃদ্ধি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকলেও খাবারের খরচ ক্রমাগত ভোক্তাদের বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
তাজা ফলমূল ও শাকসবজির বাজারে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং কিছু অঞ্চলে কৃষি উৎপাদনে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এসব পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, এক বছরের ব্যবধানে টমেটোর দাম ৪৫ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাও অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি, জলবায়ুজনিত সমস্যা এবং কৃষিখাতে ব্যবহৃত সার, জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপাদকদের এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে।
অন্যদিকে, গ্রীষ্মকালীন ছুটির মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বিমান ভ্রমণের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মে মাসে বিমান পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক মাস আগে বুক করা গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ প্যাকেজ এবং বিমান সংস্থাগুলোর বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এখন ভাড়ার মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে আসন্ন মাসগুলোতে ভ্রমণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রযুক্তি খাতেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং বৃহৎ তথ্যকেন্দ্রগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিকভাবে বিভিন্ন প্রযুক্তি উপাদানের সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারমূল্যও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
তবে অর্থনীতির সব খাত একই ধরনের চাপের মুখে নেই। আবাসন ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় ধীর হয়েছে এবং যানবাহনসহ কিছু ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হারও কমেছে। ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা আপাতত কমে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমন পরিস্থিতিতে নজর এখন কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দিকে। আগামী মাসে সুদের হার নির্ধারণের বৈঠকের আগে এটি ছিল সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন। যদিও মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি বেড়েছে, তবুও অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, আপাতত সুদের হারে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত সাময়িক ও বাহ্যিক কারণ কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হলে মূল্যচাপও ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।
বর্তমানে কানাডার অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে অবস্থান করছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিম্নমুখী ধারা বজায় রাখে এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, তাহলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতির হার আবারও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ফিরে আসতে পারে।
তবে আপাতত কানাডার ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, আর সেই চাপ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।



