
জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমবে এমন প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ ভোক্তা উভয়েরই। কিন্তু সেই আশায় আপাতত জল ঢেলে দিয়েছে মে মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি এবং বিমান ভ্রমণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কানাডার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যদিও অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হলেও এটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। কানাডার পরিসংখ্যান সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ২ শতাংশে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ। গত বছরের শেষভাগের পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির হার। কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতির গতি নিয়ন্ত্রণে আসার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল, মে মাসের তথ্য সেই ধারায় একটি বড় ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা কানাডার বাজারেও সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি শুধু গাড়িচালকদের জন্য অতিরিক্ত খরচ তৈরি করেনি, বরং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার ব্যয়ও বাড়িয়েছে। ফলে উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার পকেটেই এসে পড়েছে। তবে কিছুটা আশার খবরও রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে পরিবহন ব্যয় কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপও কিছুটা হ্রাস পেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখনও খাদ্যপণ্যের বাজারেই দেখা যাচ্ছে। মে মাসে মুদি পণ্যের দাম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, টানা ১৬ মাস ধরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে তাজা ফল ও শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং আবহাওয়াজনিত সমস্যার কারণে এই খাতে মূল্যচাপ বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে টমেটোর দাম। এক বছরের ব্যবধানে এর মূল্য ৪৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সঙ্গে অন্যান্য সবজির দামও বাড়তে থাকায় পরিবারের মাসিক খাদ্য ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিকূল আবহাওয়া কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি সার, জ্বালানি, যন্ত্রপাতি ও কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে। উৎপাদকদের সেই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমান ভাড়াও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মে মাসে বিমান পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হারেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক মাস আগে বুক করা গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণ প্যাকেজ, বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব এখন পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে গ্রীষ্মকালজুড়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আগের তুলনায় বেশি ব্যয়বহুল থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবারভিত্তিক ভ্রমণ পরিকল্পনা করা অনেকের জন্য বাড়তি খরচের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব এবার প্রযুক্তিপণ্য খাতেও দৃশ্যমান হয়েছে। কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি সরঞ্জামের দাম বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের দ্রুত সম্প্রসারণকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে এআই-ভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র ও ক্লাউড অবকাঠামোর চাহিদা বাড়ার ফলে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
তবে মূল্যস্ফীতির পুরো চিত্রই যে নেতিবাচক, তা নয়। আবাসন ব্যয়ের বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কমেছে। একই সঙ্গে যানবাহনসহ কিছু ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এই খাতগুলোতে মূল্যচাপ কমে আসা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। যদি খাদ্য ও জ্বালানি খাতের অস্থিরতা কিছুটা কমে, তাহলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারে।
আগামী মাসে কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নির্ধারণী বৈঠকের আগে এটিই ছিল সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির প্রতিবেদন। স্বাভাবিকভাবেই বাজারে প্রশ্ন উঠেছে মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি কি সুদের হার বাড়ানোর পথ তৈরি করবে? তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, আপাতত সুদের হারে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির বড় অংশই জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মতো অস্থায়ী কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো যদি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে, তাহলে মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে কমে আসবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্ভবত আরও কিছু মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা স্পষ্ট হওয়ার পরই বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে।
বর্তমানে কানাডার অর্থনীতি এমন এক সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে এবং খাদ্য সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে, তাহলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও কমতে শুরু করতে পারে। তবে বৈশ্বিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে মূল্যচাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সার্বিকভাবে বলা যায়, মে মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান কানাডার অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদিও পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়, তবুও খাদ্য, জ্বালানি এবং ভ্রমণ ব্যয়ের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলছে। এখন নজর থাকবে আগামী কয়েক মাসের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর দিকে, যা নির্ধারণ করবে মূল্যস্ফীতির এই নতুন চাপ সাময়িক নাকি আরও দীর্ঘমেয়াদি।



