ঋণের চাপে খেলনা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

আলী আহমেদ

আদালতের অনুমোদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড-সংক্রান্ত স্বত্ব বিক্রি।

একসময় শিশুদের স্বপ্নের জগৎ মানেই ছিল টয়েজ “আর” আস। জন্মদিন, বড়দিন কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষে নতুন খেলনা কেনার কথা উঠলেই অসংখ্য পরিবারের প্রথম পছন্দ ছিল এই প্রতিষ্ঠান। কানাডাজুড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই পরিচিত ব্র্যান্ড এখন অস্তিত্ব রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট, বিক্রির পতন এবং পরিবর্তিত খুচরা বাজারের চাপে বিপর্যস্ত প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ও স্বত্ব বিক্রির প্রক্রিয়ায় সম্প্রতি নতুন অগ্রগতি হয়েছে। অন্টারিওর একটি আদালত টয়েজ “আর” আস কানাডার বিভিন্ন সম্পদ ও অধিকার তিনটি পৃথক ক্রেতার কাছে বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির পাওনাদারদের বকেয়া পরিশোধের পথ কিছুটা প্রশস্ত করলেও ব্র্যান্ডটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

আদালতের অনুমোদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড-সংক্রান্ত স্বত্ব বিক্রি। এর আওতায় টয়েজ “আর” আস নাম, লোগো, বিপণন-সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ এবং বহু পরিচিত বাণিজ্যিক উপাদান একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। এই সম্পদের তালিকায় রয়েছে শিশুদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় জিরাফ চরিত্র ‘জিওফ্রে’, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের বিজ্ঞাপনী সুর এবং বিভিন্ন প্রচারাভিযানে ব্যবহৃত বহুল পরিচিত স্লোগান। আদালতের নথি অনুযায়ী, প্রায় দেড় শতাধিক ব্র্যান্ড-সম্পর্কিত অধিকার এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। খুচরা বিক্রয় ব্যবসায় অনেক সময় দোকান বা সম্পদের চেয়েও ব্র্যান্ডের মূল্য বেশি হয়ে ওঠে। টয়েজ “আর” আসের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট হয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলেও এর নাম এখনও বহু ভোক্তার মনে আবেগ ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।

বর্তমান মালিক ডগ পুটম্যানের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান টয়েজ “আর” আসের অবশিষ্ট বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান কিছু দোকানের ইজারা অধিকার, মজুত পণ্য, দোকানের আসবাব ও সরঞ্জাম, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার চুক্তি এবং বিভিন্ন আর্থিক হিসাব-সংক্রান্ত সম্পদ। আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, পুটম্যান আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত টয়েজ “আর” আস নাম ব্যবহার করার অনুমতি পেয়েছেন। এরপর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ব্যবসায়িক সূত্রগুলোর ধারণা, তিনি হয় ব্র্যান্ডের নতুন মালিকদের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের চেষ্টা করবেন, অথবা সম্পূর্ণ নতুন নামে ব্যবসা পরিচালনার পথ বেছে নিতে পারেন। ফলে আগামী কয়েক মাস প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ পরিচয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিক্রয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলের ভন মিলস এলাকায় অবস্থিত একটি শাখার ইজারা অন্য একটি খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে গ্রাহকদের জানানো হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট শাখাটি অদূর ভবিষ্যতে কার্যক্রম বন্ধ করে দেবে। ফলে স্থানীয় গ্রাহকদের জন্য এটি হবে আরেকটি পরিচিত খেলনার দোকানের বিদায়। খুচরা বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শপিং সেন্টারগুলোর ভাড়া বৃদ্ধি এবং অনলাইন বিক্রির প্রসারের কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী স্টোর এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

টয়েজ “আর” আসের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া সংকট নয়। গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিষ্ঠানটি ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপে ছিল। পাওনাদারদের সুরক্ষার আওতায় যাওয়ার আগেই মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি অর্ধশতাধিক শাখা বন্ধ করে দেয়। এরপর আরও কয়েকটি শাখা কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে কানাডাজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে মাত্র ১৫টি শাখা। কর্মীর সংখ্যাও নেমে এসেছে প্রায় ২৬০ জনে। একসময় যেখানে শত শত কর্মী এবং বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা পরিচালনা করত, সেখানে বর্তমান চিত্র স্পষ্টভাবেই সংকোচনের ইঙ্গিত দেয়।

আদালতে দাখিল করা আর্থিক নথিপত্রে দেখা গেছে, বিভিন্ন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে টয়েজ “আর” আসের বকেয়া ঋণের পরিমাণ অন্তত ১২ কোটি ডলারের বেশি। এছাড়া বিভিন্ন সম্পত্তির মালিক, লিজদাতা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পরিশোধ বাকি রয়েছে। আদালতের অনুমোদিত বিক্রয় প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে এসব দায়ের একটি অংশ পরিশোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে বিক্রয় থেকে পাওয়া অর্থ সব বকেয়া পরিশোধের জন্য যথেষ্ট হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

খুচরা বিক্রয় খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টয়েজ “আর” আসের সংকট শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার গল্প নয়। বরং এটি বিশ্বব্যাপী খুচরা ব্যবসার পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রতিফলন। গত এক দশকে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ভোক্তারা এখন ঘরে বসেই অসংখ্য বিকল্পের মধ্যে থেকে পণ্য নির্বাচন করতে পারছেন। এর ফলে বড় আকারের শোরুমনির্ভর ব্যবসাগুলো ক্রমশ চাপে পড়েছে। বিশেষ করে খেলনার বাজারে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ডিসকাউন্ট স্টোর এবং বহুমুখী খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা টয়েজ “আর” আসের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই টয়েজ “আর” আস কি নতুন রূপে ফিরে আসবে, নাকি ধীরে ধীরে অতীতের স্মৃতিতে পরিণত হবে? নতুন মালিকানায় ব্র্যান্ডটির ব্যবহার কীভাবে হবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কোনো ঘোষণা আসেনি। বর্তমান নাম বজায় রাখা হবে কি না, নতুন কোনো ব্যবসায়িক অংশীদার যুক্ত হবে কি না, কিংবা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে বাজারে প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা করা হবে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, টয়েজ “আর” আস শুধুমাত্র একটি দোকানের নাম নয়; এটি বহু মানুষের শৈশব স্মৃতির অংশ। সেই আবেগকে কাজে লাগিয়ে ব্র্যান্ডটি আবারও বাজারে জায়গা করে নিতে পারে কি না, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ওপর। একসময় শিশুদের আনন্দ, বিস্ময় এবং কল্পনার জগতের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠান এখন নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত। আর সেই লড়াইয়ের ফলাফলই নির্ধারণ করবে টয়েজ “আর” আস নতুন অধ্যায় শুরু করবে, নাকি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে আরেকটি হারিয়ে যাওয়া খুচরা সাম্রাজ্য হিসেবে।

Related Articles

Back to top button