
অটো শিল্পে দীর্ঘদিনের শক্ত অবস্থানের জন্য পরিচিত কানাডা বর্তমানে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রসারে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে দেশের ঐতিহ্যবাহী গাড়ি উৎপাদন খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা। শিল্প সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারের সাম্প্রতিক নীতি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশল কানাডার অটো শিল্পে যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে, তেমনি বহু বছরের গড়ে ওঠা উৎপাদন কাঠামোকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে কানাডা সরকার পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর যানবাহন উৎপাদনে বৈশ্বিক বিনিয়োগ টানার জন্য সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে। এ প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, যা শিল্পমহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
দেশীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশ মনে করছে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি স্বল্পমূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ি কিংবা যন্ত্রাংশ নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে, তাহলে কানাডার নিজস্ব উৎপাদন শিল্প কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে স্থানীয় কারখানাগুলো উৎপাদন ব্যয়, শ্রম ব্যয় এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার কারণে এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যদি কম খরচে উৎপাদিত আমদানিকৃত পণ্য যুক্ত হয়, তাহলে স্থানীয় শিল্পের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শিল্প খাতের নেতারা বলছেন, প্রকৃত বিনিয়োগের অর্থ শুধুমাত্র কোনো বিদেশি ব্র্যান্ডের গাড়ি এনে স্থানীয়ভাবে সংযোজন করা নয়। বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প বিনিয়োগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। অন্যথায় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে।
অটো শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি হাজার হাজার পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শুধু বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানই নয়, তাদের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানও এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি ভোক্তা সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সুরক্ষার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণের জন্য সরকার নির্গমন কমানোর যে নীতি অনুসরণ করছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। শিল্পমহলের একটি অংশের অভিযোগ, নতুন পরিবেশগত বিধিনিষেধ এবং উৎপাদন খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ কানাডাকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো নতুন প্রকল্প স্থাপনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো কিংবা অন্যান্য কম ব্যয়বহুল দেশকে বেছে নিতে পারে।
কানাডার অটো শিল্পের অন্যতম বড় শক্তি হলো উত্তর আমেরিকার সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থা। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে গড়ে ওঠা সরবরাহ শৃঙ্খল ও উৎপাদন নেটওয়ার্ক বহু বছর ধরে এই শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রেখেছে। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সংযোজন পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ সীমান্তের দুই পাশে সম্পন্ন হয়। ফলে কোনো দেশের নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব পুরো অঞ্চলের শিল্প ব্যবস্থার ওপর পড়ে।
এই বাস্তবতায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: কানাডা কি নতুন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোবে, নাকি বিদ্যমান শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষার দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে? অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধুমাত্র নতুন বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকলে স্থানীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার পরিবর্তনের বিরোধিতা করলে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে কানাডার গাড়ি শিল্পকে ঘিরে চলমান বিতর্ক এখন আর কেবল বৈদ্যুতিক গাড়ি বা বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি কর্মসংস্থান, শিল্পনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। আগামী দিনে সরকারের সিদ্ধান্ত এবং শিল্পখাতের প্রতিক্রিয়া নির্ধারণ করবে কানাডার অটো শিল্প কোন পথে এগোবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার নতুন যুগে দেশটি কতটা শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



