
মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সাধারণত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, বাজারদর কিংবা সুদের হার নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু অন্টারিওতে পরিচালিত একটি নতুন জরিপ দেখাচ্ছে, খাদ্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এখন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণেও গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে একা বসবাসকারী মানুষদের জন্য মুদি পণ্যের ক্রমবর্ধমান খরচ একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ইন্টার্যাকের উদ্যোগে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, অন্টারিওর প্রায় ৭৯ শতাংশ একক বাসিন্দা মনে করেন, খাদ্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাজার খরচ কমানোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হচ্ছে না। অনেকেই বলছেন, কেনাকাটার তালিকা ছোট করা, অপ্রয়োজনীয় পণ্য বাদ দেওয়া কিংবা ছাড়ের অফার খোঁজার পরও মাস শেষে মুদি পণ্যের বিল আগের তুলনায় বেশি থেকেই যাচ্ছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অন্টারিওতে একা বসবাসকারী একজন ব্যক্তি প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১০২ ডলার খাদ্যপণ্যের পেছনে ব্যয় করেন। অন্যদিকে একসঙ্গে বসবাসকারী পরিবার বা দম্পতিদের ক্ষেত্রে মাথাপিছু সাপ্তাহিক ব্যয় প্রায় ৮০ ডলার। অর্থাৎ একক পরিবারে বসবাসকারীরা একই ধরনের খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে গিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো একা থাকা ব্যক্তিরা বড় পরিমাণে পণ্য কিনে মূল্যছাড়ের সুবিধা নিতে পারেন না। অনেক সুপারমার্কেটেই বড় প্যাকেজ বা মাল্টি-বাই অফারের মাধ্যমে তুলনামূলক কম দামে পণ্য বিক্রি করা হয়। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে সেই পরিমাণ পণ্য ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা বেশি ইউনিট মূল্যে পণ্য কিনতে বাধ্য হন। এছাড়া বাজারে একজনের জন্য উপযোগী পরিমাণে খাদ্যসামগ্রী সবসময় পাওয়া যায় না। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাবার নষ্ট হয়, যা পরোক্ষভাবে ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
জরিপে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। একসঙ্গে বসবাসকারী দম্পতিদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে মুদি পণ্যের ব্যয় নিয়ে তাদের সম্পর্কে মতবিরোধ বা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক দম্পতি জানিয়েছেন, বাজার করতে গেলে একজন সাধারণত পূর্বনির্ধারিত তালিকা অনুসরণ করতে চান, অন্যজন আবার প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত পণ্য বা তাৎক্ষণিক পছন্দের জিনিস কিনে ফেলেন। এই ভিন্নধর্মী ব্যয় অভ্যাসই অনেক ক্ষেত্রে বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যখন পরিবারের ব্যয়ের বড় অংশ খাদ্যপণ্যের পেছনে চলে যায়, তখন প্রতিটি কেনাকাটার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে আগে যেসব বিষয়কে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, এখন সেগুলো নিয়েও আলোচনা বা মতবিরোধ দেখা দিচ্ছে।
প্রজন্মভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সহস্রাব্দ বা মিলেনিয়াল প্রজন্মের মধ্যে খাদ্যপণ্যের ব্যয় সম্পর্কের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে। এই বয়সী উত্তরদাতাদের প্রায় ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, মুদি পণ্যের খরচ তাদের সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি করেছে। অন্যদিকে প্রবীণ প্রজন্মের মধ্যে একই ধরনের অভিজ্ঞতার হার মাত্র ১৭ শতাংশ। তরুণ ও মধ্যবয়সী প্রজন্ম সাধারণত আবাসন ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, সন্তান লালন-পালন এবং জীবনযাত্রার অন্যান্য ব্যয়ের চাপের মধ্যে থাকেন। ফলে খাদ্যপণ্যের অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি তাদের আর্থিক পরিকল্পনায় সরাসরি প্রভাব ফেলে।
মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে অন্টারিওর বহু মানুষ তাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, তারা আগের তুলনায় উন্নতমানের বা দামি মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। অনেকেই এখন সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজছেন অথবা মাংসের পরিবর্তে অন্য খাদ্যপণ্য ব্যবহার করছেন। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পরিবর্তে স্টোর ব্র্যান্ড বা নামবিহীন পণ্য কিনতে শুরু করেছেন। অনেক পরিবারের জন্য এটি এখন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠেছে।
অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও মানুষ পুরোপুরি নিজেদের ছোটখাটো আনন্দ থেকে সরে আসতে রাজি নন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক অন্টারিওবাসী জানিয়েছেন, তারা এখনও চিপস, চকোলেট বা অনুরূপ পছন্দের খাবার মাঝে মাঝে কিনে থাকেন। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের ছোট ব্যয় মানুষের মানসিক স্বস্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই বড় ব্যয় কমালেও অনেকেই এসব ছোটখাটো ব্যক্তিগত আনন্দ ধরে রাখতে চান।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু আর্থিক নয়, মানসিক চাপেরও কারণ হয়ে উঠছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৪ শতাংশ অন্টারিওবাসী জানিয়েছেন, বাজার খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা তাদের জন্য উদ্বেগ এবং মানসিক চাপের উৎস। জাতীয় পর্যায়ে যেখানে এই হার ৬০ শতাংশ, সেখানে অন্টারিওর হার আরও বেশি হওয়া বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। অনেক উত্তরদাতা জানিয়েছেন, প্রতি সপ্তাহে বাজার করতে যাওয়ার আগে এখন তাদের বাজেট নিয়ে বাড়তি হিসাব করতে হয়। অনেকে আবার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও দ্বিধায় ভোগেন, কারণ মাস শেষে আর্থিক চাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জরিপের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, যারা আগে সঙ্গীর সঙ্গে বসবাস করতেন কিন্তু বর্তমানে একা থাকেন, তাদের ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন যে বাজার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারার কারণে তারা স্বস্তি অনুভব করেন। তাদের মতে, কী কিনবেন, কত খরচ করবেন কিংবা কোন পণ্য বেছে নেবেন এসব বিষয়ে অন্য কারও সঙ্গে সমন্বয় করতে না হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির প্রভাব এখন আর কেবল অর্থনৈতিক সূচক বা বাজারদরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি মানুষের জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অন্টারিওর এই জরিপ স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু পকেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও সামাজিক সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিও বদলে দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।



