উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি, তবে আপাতত বহাল থাকছে বর্তমান ব্যবস্থা

জামির হোসেন

চুক্তির বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অংশীদার দেশগুলোর জানানো প্রয়োজন ছিল তারা বর্তমান কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখতে আগ্রহী কি না।

উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নির্ধারিত পর্যালোচনা সময়সীমা অতিক্রম করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সংকট বা অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়নি। বরং বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি চুক্তির সমাপ্তির ইঙ্গিত নয়; বরং নতুন পর্যায়ের আলোচনা শুরুর একটি আনুষ্ঠানিক ধাপ। আগামী কয়েক বছরে তিন দেশের রাজনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং পারস্পরিক সমঝোতার ওপর নির্ভর করবে এই চুক্তির ভবিষ্যৎ।

চুক্তির বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অংশীদার দেশগুলোর জানানো প্রয়োজন ছিল তারা বর্তমান কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখতে আগ্রহী কি না। কানাডা ও মেক্সিকো আগেই তাদের ইতিবাচক অবস্থান স্পষ্ট করলেও যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে একই ধরনের আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেয়নি। তবে এই পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই চুক্তি বাতিল বা স্থগিত হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার ফলে এখন থেকে প্রতিবছর চুক্তির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে একটি নিয়মিত পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চলবে। অর্থাৎ, বিদ্যমান বাণিজ্য কাঠামো আগের মতোই বহাল থাকবে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সুযোগও অব্যাহত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে একাধিকবার ভিন্নধর্মী মন্তব্য করেছেন। কখনও তিনি চুক্তির কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, আবার কখনও ভবিষ্যৎ আলোচনার মাধ্যমে নতুন সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। ফলে ওয়াশিংটনের অবস্থান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশ চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে এই ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করতে পারে না। এর জন্য নির্দিষ্ট আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা, নোটিশ এবং অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের প্রয়োজন হয়।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। যদিও কানাডার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এখনও শুরু হয়নি, তবে দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তিন দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হতে পারে। সেখানে শুল্কনীতি, উৎপাদন কাঠামো, বিনিয়োগ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

উত্তর আমেরিকার তিন দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি হঠাৎ বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয়। বিশেষ করে মোটরযান শিল্প, কৃষিপণ্য, জ্বালানি, ইস্পাত, উৎপাদনশিল্প এবং আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই তিন দেশের হাজারো প্রতিষ্ঠান একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ একাধিকবার সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন দেশে উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে বাজারে আসে। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্কের বড় ধরনের পরিবর্তন পুরো অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এই বাস্তবতাই চুক্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে কাজ করছে।

কানাডার সাবেক বাণিজ্য আলোচকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যুক্তরাষ্ট্র এখনো উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দিতে আগ্রহী নয়। তবে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ কানাডার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম এবং মোটরযান শিল্পে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক কানাডার উৎপাদকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে ভবিষ্যৎ আলোচনায় এই বিষয়গুলো কানাডার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উঠে আসতে পারে।

শুধু সরকার নয়, উত্তর আমেরিকার বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর ভূমিকাও এই আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ কাঠামো ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো। এ কারণে ব্যবসায়িক মহলও তিন দেশের সরকারকে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ অব্যাহত রাখতে পারে।

আগামী কয়েক বছর উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই ত্রিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক সমঝোতা, শুল্কনীতি, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চুক্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা না থাকলেও আসন্ন আলোচনাগুলোই নির্ধারণ করবে উত্তর আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগামী এক দশকে কোন পথে এগোবে। তাই বিনিয়োগকারী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বাজার সব পক্ষের নজর এখন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর আসন্ন আলোচনার দিকে।

Related Articles

Back to top button