কানাডায় কিশোরদের অপরাধচক্রে টানার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ

কামরুল ইসলাম

কানাডার বড় শহরগুলোতে কিশোর ও তরুণদের সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

কানাডার বড় শহরগুলোতে কিশোর ও তরুণদের সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে টরন্টোসহ বিভিন্ন শহরে একাধিক গোলাগুলি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অপরাধবিজ্ঞানী এবং সমাজকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, সংগঠিত অপরাধচক্র এখন আগের চেয়ে আরও কৌশলী উপায়ে অল্প বয়সী ছেলেদের নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে। দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ, সামাজিক প্রভাব, নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কিংবা সহজ জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে অনেক কিশোরকে অপরাধের জগতে টেনে নেওয়া হচ্ছে।

এই প্রবণতা শুধু অপরাধ বৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি কানাডার নগর সমাজে বিদ্যমান নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটেরও প্রতিফলন। তাই সমস্যাটিকে শুধুমাত্র পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হবে না। বরং প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কার্যকর সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

একসময় অপরাধচক্রে নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রতিবেশী বা স্থানীয় যোগাযোগের ওপর নির্ভর করা হতো। তবে প্রযুক্তির বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার সেই চিত্র বদলে দিয়েছে। এখন বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ব্যক্তিগত বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ এবং বন্ধুবৃত্তের মাধ্যমে কিশোরদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

অপরাধচক্রগুলো সচেতনভাবেই এমন তরুণদের বেছে নেয়, যারা জীবনের কোনো না কোনো সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক অস্থিরতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ কিংবা নিজের পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতার সংকট এসব দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়।

এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই গোপন ও পরিকল্পিত যে মূল পরিকল্পনাকারীরা প্রায় সব সময় আড়ালে থেকে যায়। বিপজ্জনক দায়িত্ব, অস্ত্র বহন, মাদক পরিবহন বা হামলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোতে ব্যবহার করা হয় অল্প বয়সী ছেলেদের, যাদের অনেকেই বুঝতে পারে না তারা কত বড় অপরাধের অংশ হয়ে উঠছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিশোররা জন্মগতভাবে অপরাধপ্রবণ নয়। বরং জীবনের বিভিন্ন সংকট তাদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা শেষ পর্যন্ত অপরাধচক্রের দিকে ঠেলে দেয়। অনেক তরুণ পরিবারে পর্যাপ্ত সময়, স্নেহ বা দিকনির্দেশনা পায় না। আবার কেউ অর্থনৈতিক সংকটে দ্রুত অর্থ উপার্জনের পথ খোঁজে। অন্যদিকে, একাকিত্ব, হতাশা বা সমাজে নিজের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেও অনেকেই এমন গোষ্ঠীর প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে তাদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয়।

অপরাধচক্রগুলো ঠিক এই মানসিক অবস্থাকেই কাজে লাগায়। প্রথমে বন্ধুত্ব, সহায়তা বা সহজ উপার্জনের সুযোগ দেখানো হয়। এরপর ধীরে ধীরে তাদের আরও গুরুতর অপরাধে যুক্ত করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভয়ভীতি, ঋণ, ব্ল্যাকমেইল বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেও কিশোরদের অপরাধের সঙ্গে আটকে রাখা হয়।

অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় শুধু গ্রেপ্তার বা শাস্তির ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। বরং যেসব তরুণ ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের যত দ্রুত সম্ভব চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। তাদের মতে, স্কুল, পরিবার, স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেবা জোরদার করা, পরিবারকে সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের জন্য নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধচক্রের নিয়োগ কৌশল সম্পর্কে তরুণদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কানাডার বিভিন্ন শহরে গ্রীষ্মকালকে সাধারণত কিশোর অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক তরুণের হাতে অতিরিক্ত অবসর সময় থাকে, যা অপরাধচক্রের জন্য সদস্য সংগ্রহ সহজ করে তোলে। এ কারণেই টরন্টোসহ বিভিন্ন শহরে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি সংগঠনগুলো খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, পরামর্শদান এবং নিরাপদ কমিউনিটি কর্মসূচি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, তরুণদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশ এবং বিকল্প সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা অপরাধচক্রের প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারবে।

কিশোর অপরাধের বর্তমান প্রবণতা শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। অর্থনৈতিক বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সংকট, পারিবারিক অস্থিরতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব মিলিয়েই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।

তাই দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অপরাধ দমন নয়, বরং তরুণদের জন্য নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ তৈরি করতে পারলেই সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। আর সেটিই হতে পারে কানাডার আগামী প্রজন্মকে সহিংসতা ও অপরাধের পথ থেকে দূরে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

Related Articles

Back to top button