
জাতীয় দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত একটি নতুন জনমত জরিপ কানাডার নাগরিকদের মানসিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রতি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব এখনো দৃঢ় রয়েছে। তবে একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে উদ্বেগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে কানাডাকে নিয়ে মানুষের মূল্যায়নে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশকে ভালোবাসেন, কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিতও।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশ জানিয়েছেন, কানাডীয় পরিচয় তাদের কাছে গর্বের বিষয়। তারা মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় কানাডা এখনো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ, মানবাধিকার, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সামাজিক সহনশীলতার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক উদাহরণ। তবে একই সঙ্গে অনেকেই সতর্ক করেছেন যে, শুধুমাত্র জাতীয় গর্ব দিয়ে বাস্তব সমস্যাগুলোকে আড়াল করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, একটি দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকা এবং সেই দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া দুটি অনুভূতিই একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।
জরিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে জাতীয় অনুভূতির পার্থক্য। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে কানাডার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে। কিছু রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলক আশাবাদী। তাদের বিশ্বাস, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব এবং কানাডা দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। অন্যদিকে বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। তারা মনে করছেন, বর্তমান নীতিগত দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পার্থক্য শুধুমাত্র রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রত্যাশার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী কানাডীয়দের জাতীয় পরিচয়বোধকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে টানাপোড়েনের পর অনেক নাগরিক নিজেদের জাতীয় পরিচয়কে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে শুরু করেছেন। বাইরের চাপ বা আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার সময় সাধারণত মানুষের মধ্যে জাতীয় সংহতির অনুভূতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কানাডার ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশ নিয়ে ইতিবাচক অনুভূতির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের মতে, কানাডার সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে : শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তিগত কাঠামো, মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ঐতিহ্য। অনেকের মতে, এসব বৈশিষ্ট্যই কানাডাকে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং নাগরিকদের মধ্যে জাতীয় গর্বের অনুভূতি ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে যারা দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তাদের প্রধান অভিযোগ অর্থনৈতিক বাস্তবতা ঘিরে। জরিপে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে কয়েকটি বিষয় : দ্রুত বাড়তে থাকা আবাসনের মূল্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘ অপেক্ষার সময়, কর্মসংস্থান ও আয়ের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বিভাজনের বৃদ্ধি। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের মধ্যে এই উদ্বেগ তুলনামূলক বেশি। তাদের মতে, ভালো আয় থাকা সত্ত্বেও অনেক পরিবারের জন্য নিজস্ব বাড়ি কেনা কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
জরিপে বয়সভেদেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। প্রবীণদের একটি বড় অংশ দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তারা মনে করেন, কানাডা অতীতেও বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করেছে এবং ভবিষ্যতেও তা সম্ভব হবে। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে উদ্বেগের মাত্রা বেশি। চাকরির বাজার, আবাসনের উচ্চ ব্যয়, শিক্ষাজনিত ঋণ এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তবে ইতিবাচক বিষয় হলো, মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্বের অনুভূতি দুই প্রজন্মের মধ্যেই শক্তিশালী রয়েছে।
সামাজিক গবেষকদের মতে, এই জরিপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো দেশপ্রেম মানেই অন্ধ সমর্থন নয়। বরং প্রকৃত দেশপ্রেমের অর্থ হলো দেশের শক্তির পাশাপাশি দুর্বলতাগুলোকেও স্বীকার করা এবং সেগুলোর উন্নতি কামনা করা। তাদের মতে, অধিকাংশ কানাডীয় দেশের প্রতি আস্থা হারাননি। বরং তারা চান, সরকার বাস্তব সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান করুক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ কানাডা পায়।
জাতীয় গর্ব ধরে রাখতে হলে শুধু প্রতীকী উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধানই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অর্থনীতি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের মতো বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে জরিপটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। কানাডীয়রা তাদের দেশ নিয়ে গর্বিত, দেশের মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং জাতীয় পরিচয়কে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করেন। তবে একই সঙ্গে তারা এমন একটি কানাডা দেখতে চান, যেখানে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা, কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। জাতীয় গর্ব ও বাস্তব প্রত্যাশার এই সমন্বয়ই বর্তমান কানাডীয় সমাজের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি হিসেবে উঠে এসেছে।



