
কানাডার জ্বালানি নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত আরেকটি বড় তেল পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ জোরদার করছে আলবার্টা সরকার। লক্ষ্য, তেলবালু অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের একটি গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছে দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে এশিয়ায়, রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি করা। তবে পরিকল্পনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের আগেই শিল্পমহল, অর্থনীতিবিদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে দিয়েছেন রাজনৈতিক ঘোষণা যতটা সহজ, বাস্তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন। তাদের মতে, অর্থায়ন, পরিবেশগত অনুমোদন, বাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই চারটি বড় চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে না পারলে নতুন পাইপলাইন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।
প্রাদেশিক সরকার বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করার কথা রয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য গঠিত ফেডারেল দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেবে আলবার্টা সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তেলবালু অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পশ্চিম উপকূলের একটি সমুদ্রবন্দরে পরিবহনের জন্য নতুন পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। তবে পাইপলাইনটি ঠিক কোন বন্দরে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সরকারি সূত্রের দাবি, প্রকল্পটি শুধু আলবার্টার অর্থনীতির জন্য নয়, পুরো কানাডার জ্বালানি রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আলবার্টা সরকারের সঙ্গে ফেডারেল সরকারের এ বিষয়ে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে সেই সমর্থনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে অটোয়া। তেল উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ হবে, তা মোকাবিলায় বড় পরিসরে কার্বন ক্যাপচার, ইউটিলাইজেশন অ্যান্ড স্টোরেজ প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। অর্থাৎ পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি দূষণ কমানোর কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও বাধ্যতামূলক হবে। এতে বোঝা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জলবায়ু নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক আলবার্টা সফরের পর বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চলছে এবং নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রস্তাব জমা দেওয়ার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই ফেডারেল সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান আরও পরিষ্কার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ইতিবাচক মনোভাব থাকলেও সেটি প্রকল্প বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় অবকাঠামো প্রকল্প লাভজনক করতে হলে তেলবালু অঞ্চলের বৃহৎ উৎপাদক কোম্পানিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণ অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে কার্বন নির্গমন সংক্রান্ত ব্যয় বৃদ্ধি, কঠোর পরিবেশনীতি এবং ভবিষ্যতের জ্বালানি বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখনই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনা থাকলেও বেসরকারি খাতের আস্থা ছাড়া প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পাওয়া কঠিন হবে।
আলবার্টা সরকারের লক্ষ্য আগামী অক্টোবরের মধ্যেই প্রকল্পটিকে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। এরপর ২০২৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে আগামী দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাইপলাইন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে অর্থায়ন নিশ্চিত করা, পরিবেশগত মূল্যায়ন সম্পন্ন করা, বিভিন্ন সরকারি অনুমোদন নেওয়া এবং সম্ভাব্য আইনি জটিলতা মোকাবিলা করতে হবে। ফলে নির্ধারিত সময়সূচি বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা সম্ভব হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আগামী অক্টোবরে আলবার্টায় একাধিক গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে কানাডার সঙ্গে প্রদেশটির ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও থাকবে। গণভোটের ফলাফল না আসা পর্যন্ত বহু বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে পারে। কারণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পে অর্থ লগ্নি করার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
নতুন পাইপলাইন নির্মাণের অন্যতম যুক্তি হলো এশিয়ার বাজারে আরও বেশি তেল রপ্তানি। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান প্রবণতা সেই প্রত্যাশাকে কিছুটা প্রশ্নের মুখে ফেলছে। একসময় যেভাবে এশিয়ায় তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছিল, এখন সেই গতি অনেকটাই কমে এসেছে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন দেশের জলবায়ু নীতির কারণে ভবিষ্যতের তেলের বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। ফলে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক লাভ নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সম্পূর্ণ নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরিবর্তে বর্তমানে চালু থাকা পশ্চিমমুখী পাইপলাইনের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত এবং কম ব্যয়বহুল হতে পারে। তাদের যুক্তি, উত্তর ব্রিটিশ কলাম্বিয়া উপকূল দিয়ে নতুন রুট নির্মাণ করতে গেলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার, পরিবেশগত আপত্তি এবং দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। অতীতেও একই ধরনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প দীর্ঘ বিরোধিতা ও আইনি জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। সেই অভিজ্ঞতাও বর্তমান পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় বাড়াচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নতুন পাইপলাইন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে না। এই প্রকল্প সফল করতে হলে একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বাজারের বাস্তবতা, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং কেন্দ্র-প্রদেশের সমন্বিত অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। সব দিক অনুকূলে এলে কানাডার জ্বালানি খাতে এটি একটি যুগান্তকারী অবকাঠামো প্রকল্পে পরিণত হতে পারে। কিন্তু কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণে ব্যর্থতা দেখা দিলে এটি অতীতের বহু আলোচিত কিন্তু অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া পরিকল্পনার তালিকায় যুক্ত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



