নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন উদ্যোগ, তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরে যাচ্ছেন কার্নি

জুমু চৌধুরী

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার খোঁজার কৌশলকে সামনে রেখে আগামী সপ্তাহে তুরস্ক ও সৌদি আরবে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফরে যাচ্ছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই দুটি দেশে এটিই হবে তার প্রথম সরকারি সফর। বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের মাধ্যমে একদিকে যেমন কানাডা তার নিরাপত্তা অঙ্গীকার আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চায়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্তও উন্মোচনের চেষ্টা করবে।

সফরের প্রথম ধাপে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট (ন্যাটো)-এর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে থাকবে ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক সামরিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় যৌথ পরিকল্পনা। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার সামরিক তৎপরতা এবং আর্কটিক অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা ন্যাটোর সদস্যদের নতুন করে প্রতিরক্ষা কৌশল নির্ধারণে বাধ্য করছে। ফলে এবারের বৈঠককে শুধু নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন নয়, বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কানাডা সরকার ইতোমধ্যে দাবি করেছে, দীর্ঘদিন পর দেশটি ন্যাটোর নির্ধারিত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। কুইবেকের কুজ্জুয়াকে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ শুধু আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণের বিষয় নয়, বরং দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার জন্যও অপরিহার্য। তিনি বিশেষভাবে কানাডার উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে এবং সেখানে বিভিন্ন দেশের কৌশলগত আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে নজরদারি, অবকাঠামো এবং সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।

বর্তমান প্রতিরক্ষা ব্যয়ের লক্ষ্য পূরণ হলেও ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সামনে আরও বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতির বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে। জাতীয় আয়ের আরও বড় অংশ প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয়ের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদে এত বড় প্রতিরক্ষা ব্যয় বহন করা কতটা বাস্তবসম্মত হবে। তবে কানাডা সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ধাপে ধাপে গড়ে তোলা হবে এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

শুধু প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিরক্ষা শিল্পে অর্থায়নের নতুন কাঠামো তৈরির উদ্যোগও নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্নি। কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক দেশের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। এর মাধ্যমে যৌথভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, অস্ত্র উন্নয়ন, গবেষণা এবং নিরাপত্তা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে এবং নিরাপত্তা খাতে অর্থায়নের নতুন মডেল তৈরি হতে পারে।

শীর্ষ সম্মেলনের আগে ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ওই আলোচনায় প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউক্রেনকে অব্যাহত সামরিক ও মানবিক সহযোগিতা প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সম্মেলনের আগে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে ন্যাটো নেতৃত্বও ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইউক্রেনকে ভবিষ্যতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, সেটিও এবারের আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

তুরস্ক সফর শেষ করে সৌদি আরবে যাবেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী। সেখানে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হবে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় কানাডা নতুন বাজার ও কৌশলগত অংশীদার খুঁজছে। সেই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করাকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক দশকেরও বেশি সময় পর কোনো কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী তুরস্ক সফর করছেন। একইভাবে প্রায় ২৬ বছর পর সৌদি আরবে কানাডার কোনো প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর এই সফর দুটির আয়োজন দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অভিমত।

মার্ক কার্নির এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সফর নয়। এটি কানাডার পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন, যেখানে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কানাডা এখন একদিকে ন্যাটোর মাধ্যমে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চাইছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তারের মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করতে আগ্রহী।

তুরস্ক ও সৌদি আরব সফরকে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির কূটনৈতিক এজেন্ডার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সফর থেকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডার কৌশলগত অবস্থান আরও সুসংহত করার বার্তা উঠে আসবে বলেই ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।

Related Articles

Back to top button