
একই দেশ, একই বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব, অথচ টিকিটের বাজারে যেন দুই বিপরীত বাস্তবতা। কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ও টরন্টো দুই শহরের টিকিট বিক্রির চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শুধু আয়োজক শহর হওয়াই নয়, কোন দল খেলছে এবং মাঠে কোন তারকারা নামছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত দর্শকদের আগ্রহ নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। একদিকে ভ্যাঙ্কুভারে টিকিটের দাম কয়েক দিনের ব্যবধানে নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। অন্যদিকে টরন্টোয় একটি ম্যাচের টিকিট কিনতে গিয়েই অনেক ফুটবলপ্রেমীকে কয়েক হাজার ডলার খরচ করতে হচ্ছে। এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে কানাডার বিদায়, ম্যাচের প্রতিপক্ষের পরিবর্তন এবং বিশ্ব ফুটবলের দুই কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগ।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের সূচি ঘোষণার পর থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, স্বাগতিক কানাডা নিজেদের পরবর্তী ম্যাচ ভ্যাঙ্কুভারেই খেলবে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই হাজার হাজার সমর্থক আগেভাগে টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন। অনেকেই উচ্চমূল্য দিয়েও টিকিট কিনতে পিছপা হননি। কিন্তু গ্রুপ পর্বে সুইজারল্যান্ডের কাছে হারের ফলে কানাডার সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। ফলে যে ম্যাচে কানাডাকে দেখার আশা করেছিলেন দর্শকরা, সেখানে এখন মুখোমুখি হচ্ছে সুইজারল্যান্ড ও আলজেরিয়া। এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে টিকিটের বাজারে।
টিকিট বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণকারী একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব অনুযায়ী, কয়েক দিন আগেও যে ম্যাচের সর্বনিম্ন টিকিটের মূল্য ছিল প্রায় ২,১০০ ডলার, বর্তমানে সেই একই টিকিট ৬০০ ডলারের কিছু বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে টিকিটের দাম প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এটি শুধু মূল্য কমার ঘটনা নয়; বরং দর্শকদের আগ্রহে বড় ধরনের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরকারি টিকিট পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থাতেও একই প্রবণতা স্পষ্ট। টরন্টোর ম্যাচের জন্য সেখানে আর কোনো টিকিট অবশিষ্ট নেই। অর্থাৎ বাজারে আসামাত্রই সেগুলো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বিপরীতে ভ্যাঙ্কুভারের ম্যাচের জন্য এখনও কয়েকশ টিকিট বিক্রির তালিকায় রয়েছে এবং সেগুলো তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু পুনর্বিক্রয় বাজার নয়, সরকারি ব্যবস্থাতেও দুই শহরের চাহিদার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
টরন্টোর ম্যাচটি ঘিরে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়ার মুখোমুখি লড়াই। এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু দুই অভিজ্ঞ তারকা পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবং ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড জাদুকর লুকা মদ্রিচ। বিশ্ব ফুটবলের বিশ্লেষকদের অনেকেরই ধারণা, দুজনের কাছেই এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। তাই তাদের একই ম্যাচে, একই মাঠে, সম্ভবত শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখতে মুখিয়ে রয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। এই আবেগই টিকিটের দামকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বর্তমানে টরন্টোর ম্যাচের সবচেয়ে কম মূল্যের টিকিটও আড়াই হাজার ডলারের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আরও বেশি মূল্যেও লেনদেন হচ্ছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্টারিওর লন্ডনের বাসিন্দা থমাস লুইস সেই সব সমর্থকদের একজন, যিনি প্রায় ৩,০০০ ডলার ব্যয় করে একটি টিকিট সংগ্রহ করেছেন। তার ভাষায়, ছোটবেলা থেকেই তিনি রোনালদোর খেলা দেখে বড় হয়েছেন। তাই প্রিয় ফুটবলারের সম্ভাব্য শেষ বিশ্বকাপের ম্যাচ সরাসরি দেখার সুযোগ তিনি কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চাননি। একই ধরনের আবেগ কাজ করছে টরন্টোর বাসিন্দা ম্যাক্স আনতুনেসের মধ্যেও। তিনি এখনও দুটি টিকিটের খোঁজ করছেন। নিজের বাজেটের মধ্যে টিকিট না পেলেও আশা ছাড়েননি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অতিরিক্ত বিমানভাড়া, হোটেল ও অন্যান্য খরচ বহনের পরিবর্তে নিজের শহরে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে পর্তুগালের ম্যাচ দেখা অনেক বেশি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হবে।
টিকিট বাজারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, টরন্টো অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্তুগিজ ও ক্রোয়েশীয় বংশোদ্ভূত মানুষের বসবাস রয়েছে। নিজেদের দেশের জাতীয় দলকে সমর্থন জানাতে এই জনগোষ্ঠীর ব্যাপক আগ্রহ টিকিটের চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোনালদো ও মদ্রিচকে শেষবারের মতো বিশ্বকাপে দেখার আবেগ। ফলে স্থানীয় সমর্থক, প্রবাসী কমিউনিটি এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলপ্রেমীদের সম্মিলিত চাহিদায় টিকিটের বাজার কার্যত উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ভ্যাঙ্কুভারের ম্যাচে আলজেরিয়ার সমর্থক তুলনামূলকভাবে কম থাকায় একই ধরনের চাহিদা তৈরি হয়নি। তবে স্থানীয় আলজেরীয় কমিউনিটি দলকে সমর্থন জানাতে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি পদযাত্রার আয়োজন করেছে। আয়োজকদের বিশ্বাস, এই উদ্যোগ শুধু জাতীয় দলকে উৎসাহিতই করবে না, বরং স্থানীয় আলজেরীয় সম্প্রদায়ের ঐক্যের বার্তাও তুলে ধরবে। তবুও সামগ্রিকভাবে ম্যাচটিকে ঘিরে যে ব্যাপক আন্তর্জাতিক উন্মাদনা প্রয়োজন, তা এখনও তৈরি হয়নি বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
যদিও ভ্যাঙ্কুভারে টিকিটের চাহিদা কমেছে, তবু কানাডার প্রতি সমর্থকদের আগ্রহ কমেনি। শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে কানাডার নকআউট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিভিন্ন টিকিট বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে সেই ম্যাচের টিকিটের মূল্য প্রায় ১,০০০ ডলারের আশপাশে রয়েছে এবং সহজে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। এটি প্রমাণ করে, সমর্থকদের আগ্রহ মূলত স্বাগতিক দলকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত রয়েছে।
বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরে টিকিটের মূল্য কখনোই শুধু আসনসংখ্যা বা স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। কোন দল খেলছে, কোন শহরে ম্যাচ, কোন তারকা মাঠে নামছেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সেই দলের সাংস্কৃতিক বা আবেগগত সম্পর্ক কতটা গভীর এসব বিষয়ই বাজারকে প্রভাবিত করে। ভ্যাঙ্কুভারের ক্ষেত্রে কানাডার বিদায় দর্শকদের আগ্রহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ফলে টিকিটের দাম দ্রুত নেমে এসেছে। অন্যদিকে টরন্টোয় পর্তুগাল-ক্রোয়েশিয়া লড়াই, রোনালদো ও মদ্রিচকে ঘিরে আবেগ এবং স্থানীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে সাধারণ দর্শকদের জন্য টিকিট সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কানাডার এই দুই শহরের টিকিট বাজার যেন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই তুলে ধরছে মাঠের লড়াই যতটা গুরুত্বপূর্ণ, দর্শকদের আবেগও ততটাই শক্তিশালী। আর সেই আবেগই কখনো টিকিটের দাম নামিয়ে আনে, আবার কখনো সেটিকে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।



