
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টো ও আশপাশের এলাকায় গত কয়েক মাসে সংঘটিত একাধিক গুলিবর্ষণের ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী নেটওয়ার্ক অর্থের বিনিময়ে তরুণদের ব্যবহার করে এসব হামলা পরিচালনা করছিল। কূটনৈতিক স্থাপনা, আবাসিক ভবন এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে চালানো হামলাগুলোর পেছনে একই চক্র সক্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে পুলিশ জানায়, সাম্প্রতিক অভিযানে উদ্ধার হওয়া একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে তারা ঘটনাগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর কিছু যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় পাচার করে আনা হয়েছিল এবং সেগুলোর কয়েকটি সাম্প্রতিক আলোচিত হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধী নেটওয়ার্কটি তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এনক্রিপ্টেড বা গোপন বার্তা আদান-প্রদানের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত। সম্ভাব্য হামলাকারীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে দেওয়া হতো এবং হামলা চালানোর পাশাপাশি পুরো ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করে পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হতো। পুলিশের অভিযোগ, হামলার ভিডিও বা প্রমাণ পাঠানোর পরই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অর্থ পরিশোধ করা হতো। ফলে অপরাধ সংঘটনের পাশাপাশি তার প্রমাণ সংরক্ষণও অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ডের একটি অংশে পরিণত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থের বিনিময়ে অপরাধ সংঘটনে তরুণদের ব্যবহার করার এই প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সংগঠিত অপরাধ চক্রগুলো নিজেদের পরিচয় আড়াল করতে সরাসরি সদস্যদের পরিবর্তে অল্পবয়সী বা নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ব্যবহার করছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে টরন্টোর ডাউনটাউনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট ভবনে গুলিবর্ষণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ প্রথম বড় ধরনের সূত্র পায়। রাতের ওই হামলায় কেউ আহত না হলেও কনস্যুলেটের প্রবেশপথে ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং কূটনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনায় হামলার কারণে ঘটনাটি শুরু থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরে ছিল। তদন্ত চলাকালে ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত প্রমাণ, নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ এবং ব্যবহৃত যানবাহনের তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ দেখতে পায়, হামলার ধরন অন্যান্য কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে মিল রয়েছে।
কনস্যুলেটে হামলার কয়েক সপ্তাহ পর স্কারবরোর একটি বহুতল আবাসিক ভবনের একটি ইউনিটকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভোররাতে সংঘটিত ওই ঘটনায় ভবনের বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সৌভাগ্যবশত কেউ আহত না হলেও গুলি আবাসিক এলাকায় পৌঁছে যাওয়ায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দেয়। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যাওয়া একটি গাড়ির গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। পরবর্তীতে সেই তথ্যই আরও কয়েকজন সন্দেহভাজনের পরিচয় শনাক্ত করতে সহায়ক হয়।
স্কারবরোর ঘটনার একদিন পর এটবিকোক এলাকার একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। হামলার পর পুলিশ একটি সন্দেহভাজন গাড়িকে অনুসরণ করলে চালক দ্রুতগতিতে পালানোর চেষ্টা করে। ধাওয়ার একপর্যায়ে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। যদিও কয়েকজন আরোহী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তদন্তের মাধ্যমে পরে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, এই তিনটি ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র, যানবাহন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে একাধিক মিল পাওয়া গেছে। এসব তথ্যই তাদের একই অপরাধী নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
গত ১১ জুন ভোরে এসব ঘটনার তদন্তের অংশ হিসেবে একাধিক স্থানে সমন্বিত অভিযান চালানো হয়। তবে অভিযানের সময় পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ জানায়, একটি আবাসিক ভবনে অভিযানের সময় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পুরো পুলিশ বাহিনীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সহকর্মীরা নিহত কর্মকর্তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ এবং সাহসী সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অভিযানের পর বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে গুলিবর্ষণ, অবৈধ অস্ত্র রাখা, সংগঠিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, একজন গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজন এখনও পলাতক রয়েছে। তিনি সশস্ত্র থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কূটনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে সংঘটিত কয়েকটি হামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অপরাধী চক্রগুলো এখন নিজেদের ঝুঁকি কমাতে সরাসরি হামলায় অংশ না নিয়ে অর্থের বিনিময়ে তরুণদের ব্যবহার করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এসব নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সংগঠিত অপরাধ জগতের এই পরিবর্তিত কৌশল ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও গ্রেপ্তার ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু অপরাধীদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; তরুণদের অপরাধী নেটওয়ার্কের প্রলোভন থেকে দূরে রাখতে সামাজিক সচেতনতা, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও সমানভাবে জরুরি হয়ে উঠেছে।



