কর্মসংস্থানে নতুন অনিশ্চয়তা, বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে আবারও শত শত পদ বিলুপ্ত

মাসুদ করিম

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান ব্যবসায়িক পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কয়েকশ পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে

কানাডার শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তার মেঘ যেন আরও ঘন হয়ে উঠছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি আবাসন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচের চাপে যখন দেশের অসংখ্য পরিবার আর্থিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে, ঠিক সেই সময় দেশের অন্যতম বৃহৎ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান নতুন করে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শত শত কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন, যা শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর জন্যই নয়, বরং বৃহত্তর অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান ব্যবসায়িক পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কয়েকশ পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম বৃদ্ধি, অটোমেশন এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বাড়ানোর কৌশলের কারণে বিভিন্ন বিভাগে জনবল কমানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডার করপোরেট খাতে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত তারই ধারাবাহিকতা। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালন ব্যয় কমাতে এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মুনাফা ধরে রাখতে কর্মীসংখ্যা হ্রাস, সম্পদ বিক্রি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের ফলে অনেক প্রচলিত চাকরির প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে।

এবারের ছাঁটাইয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যরাও প্রভাবিত হচ্ছেন বলে জানা গেছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি কিছু কর্মীর জন্য আর্থিক সুবিধাসহ স্বেচ্ছায় অবসর বা স্বেচ্ছা বিদায়ের সুযোগ রাখার কথা জানিয়েছে, তবুও কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ কমেনি। শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থান সংকটাপন্ন নয়, বরং ব্যয় কমিয়ে মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাদের মতে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের পেছনে যারা বছরের পর বছর কাজ করেছেন, তারাই এখন সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন। এক ইউনিয়ন নেতার ভাষায়, “প্রযুক্তির উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অভিজ্ঞ কর্মীদের একের পর এক ছাঁটাই করা হবে। কর্মীদের ভবিষ্যৎ ও জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় আগামী কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগ পুনর্গঠন, কার্যক্রম একীভূতকরণ এবং জনবল হ্রাসের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের যুক্তি, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে প্রতিষ্ঠানকে আরও দ্রুত, দক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। তাদের বিশ্বাস, বর্তমানের কঠিন সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই সাশ্রয়ের প্রকৃত মূল্য কে দিচ্ছে? তাদের মতে, করপোরেট দক্ষতা বৃদ্ধির নামে হাজারো কর্মী ও তাদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

এটি প্রতিষ্ঠানটির প্রথম বড় ছাঁটাই নয়। গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মীসংখ্যা কমানো, সম্প্রচার কার্যক্রম সীমিত করা, সম্পদ বিক্রি এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার টেলিকম খাত বর্তমানে একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার প্রত্যাশা এই দুই চাপের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীসংখ্যা কমানোর পথ বেছে নিচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের স্থায়ী চাকরিও আর আগের মতো নিরাপদ থাকছে না।

চলতি বছর কর্মস্থলে উপস্থিতি সংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকজন কর্মী চাকরি হারানোর ঘটনাও আলোচনায় আসে। অভ্যন্তরীণ তদন্তে আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে জানিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। সেই ঘটনা কর্মক্ষেত্রে নজরদারি, কর্মীদের গোপনীয়তা এবং অফিসে উপস্থিতি নীতিমালা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। অনেক কর্মী মনে করেন, মহামারির পর কর্মপরিবেশ বদলে গেলেও প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কর্মীদের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে।

বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চাকরি হারানো মানুষদের আয় কমে গেলে তাদের ভোগব্যয়ও কমে যায়। এর ফলে স্থানীয় ব্যবসা, খুচরা বিক্রয়, আবাসন বাজার এবং সেবা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে একটি বড় প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়, সেখানে ছাঁটাইয়ের প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হয়। বিশ্লেষকদের ভাষায়, “একজন কর্মীর চাকরি হারানো মানে শুধু একটি বেতন বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পরিবারের ব্যয়, সন্তানের শিক্ষা, ঋণ পরিশোধ এবং স্থানীয় অর্থনীতির একটি অংশের ক্রয়ক্ষমতা।”

প্রতিষ্ঠানটি বলছে, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কিছু নতুন ও প্রযুক্তিনির্ভর পদে নিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তবে যারা এখন চাকরি হারাতে যাচ্ছেন, তাদের জন্য সেই সম্ভাবনা তাৎক্ষণিক স্বস্তি বয়ে আনছে না। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন চাকরি খুঁজে পাওয়া আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হচ্ছে এবং সম্পূর্ণ নতুন খাতে কাজের সুযোগ খুঁজতে হচ্ছে। ফলে শত শত কর্মীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পরবর্তী চাকরির সুযোগ কোথায়, এবং সেই সুযোগ পেতে কতটা সময় লাগবে? কানাডার শ্রমবাজারে চলমান এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও ব্যয় সংকোচনের যুগে চাকরির নিরাপত্তা আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। আর সেই বাস্তবতার সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন সাধারণ কর্মী ও তাদের পরিবার।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button