বিশুদ্ধ পানির অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আইন আনছে সরকার

মাসুদ করিম

দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে ভোগা কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার

 

দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে ভোগা কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার

 

বিশুদ্ধ পানির অধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আইন আনছে সরকার

মাসুদ করিম

দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ পানীয় জলের সংকটে ভোগা কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেল সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই আইন শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং পানি ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে আইনটির খসড়া প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্পষ্ট স্বীকৃতি না দেওয়ার অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকারের এই উদ্যোগ।

মঙ্গলবার পার্লামেন্টে উত্থাপিত প্রস্তাবিত আইনে আদিবাসী ভূখণ্ডে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, জলসম্পদ সুরক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আগামী পাঁচ বছরে ৪৬০ কোটি ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফেডারেল সরকারের দাবি, আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য পানি ও স্যানিটেশন খাতে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আর্থিক বিনিয়োগ।

সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বহু বছর ধরে অবহেলিত পানি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা বলছেন, নতুন আইন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি ক্ষমতা দেবে, যা অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত ছিল।

তবে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হলেও আইনের ভাষা ও কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বহু আদিবাসী নেতা, অধিকারকর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞ। তাদের প্রধান আপত্তি হলো, আইনে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানিকে সরাসরি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বরং এমন কিছু শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা অনেকের মতে ভবিষ্যতের একটি নীতিগত লক্ষ্য বা প্রতিশ্রুতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

সমালোচকদের আশঙ্কা, যদি বিশুদ্ধ পানির অধিকারকে স্পষ্টভাবে আইনি স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। কোনো সম্প্রদায় যদি নিরাপদ পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার চাওয়ার পথও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

একাধিক আদিবাসী নেতা বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে তারা একই ধরনের প্রতিশ্রুতি শুনে আসছেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক সম্প্রদায়ের পরিস্থিতি খুব একটা বদলায়নি। তাদের মতে, নতুন পরিকল্পনা বা প্রতিশ্রুতির চেয়ে এখন প্রয়োজন নিরাপদ পানীয় জলের অধিকারকে স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক আইনগত মর্যাদা দেওয়া। একজন আদিবাসী অধিকারকর্মী এনআরবিটিভিকে বলেন, “আমাদের জনগোষ্ঠী আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। আমরা চাই নিরাপদ পানিকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে না পারে।”

আইন বিশেষজ্ঞরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো অধিকারকে সরাসরি আইনে অন্তর্ভুক্ত না করে কেবল নীতিগত লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হলে তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপও তুলনামূলকভাবে কমে যায়।

অন্যদিকে সব আদিবাসী প্রতিনিধি এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন না। অনেকেই এটিকে বাস্তবসম্মত এবং ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বহু বছর ধরে চলমান সংকট নিরসনের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বিশেষ করে পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সম্প্রদায়ের কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি তারা স্বাগত জানিয়েছেন। একজন সম্প্রদায় প্রতিনিধি বলেন, “এটি হয়তো চূড়ান্ত সমাধান নয়, কিন্তু দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভাঙার একটি সুযোগ। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হয়।”

বর্তমানে কানাডার উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও বহু আদিবাসী সম্প্রদায় দীর্ঘমেয়াদি পানীয় জল সতর্কতার আওতায় রয়েছে। অনেক এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বাসিন্দাদের বোতলজাত পানি কিংবা বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নিরাপদ পানি সরবরাহের অভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি, জীবনযাত্রার মানের অবনতি এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থাকাই স্বাভাবিক। তাদের মতে, নিরাপদ পানির মতো মৌলিক বিষয়ে আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া উচিত ছিল সরকারের। এদিকে কয়েকজন আদিবাসী নেতা অভিযোগ করেছেন, আইন প্রণয়নের আগে তাদের সঙ্গে যথেষ্ট পরামর্শ ও আলোচনা করা হয়নি। তারা মনে করেন, যে জনগোষ্ঠীর জীবনে এই আইন সরাসরি প্রভাব ফেলবে, তাদের মতামতকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল।

পার্লামেন্টের গ্রীষ্মকালীন বিরতি সামনে থাকায় প্রস্তাবিত আইনটি দ্রুত পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ইতোমধ্যেই বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আগামী মাসগুলোতে আইনটির ভাষা, কাঠামো এবং আদিবাসী অধিকার সম্পর্কিত বিভিন্ন দিক নিয়ে আরও বিস্তৃত বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন একটিই নিরাপদ পানীয় জল কি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্বীকৃত ও সুরক্ষিত অধিকার হবে, নাকি তা কেবল সরকারের একটি নীতিগত লক্ষ্য হিসেবেই থেকে যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পানি সংকট সমাধানের ভবিষ্যৎ পথচলা।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button