
কানাডার জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা এয়ার কানাডা এখনও কাটিয়ে উঠতে পারছে না দীর্ঘস্থায়ী সংকট। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে যাত্রী চলাচল দ্রুত বেড়ে গেলেও, কোম্পানিটি আর্থিক ক্ষতি, অপারেশনাল জটিলতা, ফ্লাইট বিলম্ব এবং শ্রমিক অসন্তোষে জর্জরিত। বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাগুলো সমাধান না হলে প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এয়ার কানাডার নিট ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যদিও গত বছরের একই সময়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে এটিকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। কারণ, লাভজনক অবস্থায় ফেরার কোনো বাস্তবসম্মত অগ্রগতি নেই।
বর্তমানে কোম্পানিটির ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার, যা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক রুটে প্রতিযোগিতা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আর্থিক চাপে আরও ইন্ধন জোগাচ্ছে।
২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে এয়ার কানাডার মোট ফ্লাইটের প্রায় ৩৪ শতাংশ বিলম্বিত হয়েছে এবং ৭ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে। টরন্টো পিয়ারসন ও মন্ট্রিয়ল-ট্রুডো বিমানবন্দর এ সমস্যার কেন্দ্রস্থল। ফলস্বরূপ যাত্রীদের ভোগান্তি প্রতিনিয়ত বাড়ছে, যা সংস্থার সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে।
এয়ার কানাডায় কর্মরত প্রায় ৩৮,০০০ কর্মীর একটি বড় অংশ কর্মঘণ্টা ও বেতন নিয়ে অসন্তুষ্ট। কেবিন ক্রু ও গ্রাউন্ড স্টাফদের পাশাপাশি পাইলটরাও বেতন কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। চলতি বছরের জুলাই মাসে পাইলট অ্যাসোসিয়েশন ধর্মঘটের হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরণের কর্মবিরতি হলে কোম্পানির অপারেশন পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে।
ট্রান্সপোর্ট কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে এয়ার কানাডার বিরুদ্ধে দায়ের করা যাত্রী অভিযোগের সংখ্যা ২১,০০০-এরও বেশি, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে লাগেজ হারানো, দীর্ঘ ফ্লাইট বিলম্ব, রিফান্ড না পাওয়া এবং কাস্টমার সার্ভিসে অনিয়ম। এমন পরিস্থিতি যাত্রীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিচ্ছে।
দেশীয় বাজারে ওয়েস্টজেট ও পোর্টার এয়ারলাইনস, আর আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এয়ারলাইনগুলো এয়ার কানাডাকে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ফেলছে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যাত্রী ভাগাভাগির লড়াই কোম্পানির আয় বাড়ানোর পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রী সংখ্যা বাড়লেও এয়ার কানাডা কাঠামোগত সংস্কার, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং শ্রমিকদের দাবি পূরণে পিছিয়ে আছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে দেশের সবচেয়ে বড় বিমান পরিবহন সংস্থাটি আরও বড় সংকটে পড়বে।
এয়ার কানাডার বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করছে কেবল যাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি বা রুট সম্প্রসারণ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সংস্কার, আর্থিক শৃঙ্খলা ও গ্রাহক আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন টিকে থাকার একমাত্র পথ।



