সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

মাসুদ করিম

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, তাদের বিশেষ প্রশিক্ষিত ডিটেক্টর কুকুর ‘ধারলা’-এর সহায়তায় এক যাত্রীর কাছ থেকে ৩৭.৮ কেজি ঘোষণাবিহীন খাদ্য ও প্রাণিজ পণ্য জব্দ করা হয়েছে

কানাডার বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর টরন্টো পিয়ারসন বিমানবন্দরে আবারও সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা সামনে এল। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, তাদের বিশেষ প্রশিক্ষিত ডিটেক্টর কুকুর ‘ধারলা’-এর সহায়তায় এক যাত্রীর কাছ থেকে ৩৭.৮ কেজি ঘোষণাবিহীন খাদ্য ও প্রাণিজ পণ্য জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ওই যাত্রীকে ১,৩০০ কানাডিয়ান ডলার জরিমানা করা হয়েছে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ১৯ জুন, যখন নাইজেরিয়া থেকে টরন্টো পিয়ারসন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান এক যাত্রী। বিমানবন্দরে নিয়মিত তল্লাশির সময় বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুর ধারলা ওই যাত্রীর লাগেজে সন্দেহজনক গন্ধ শনাক্ত করে।

পরবর্তীতে কর্মকর্তারা লাগেজ পরীক্ষা করে দেখতে পান, সেখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মুরগির মাংস, গিনি ফাউল (এক ধরনের পোলট্রি), ছাগলের মাংস, গরুর চামড়া এবং গুঁড়ো দুধ বহন করা হচ্ছিল। অথচ এসব পণ্যের কোনওটিই সীমান্তে প্রবেশের সময় ঘোষণা করা হয়নি। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, এসব পণ্য তাৎক্ষণিকভাবে জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট যাত্রীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক আর্থিক জরিমানা আরোপ করা হয়েছে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি স্পষ্ট করেছে, যাত্রীকে প্রশাসনিক আর্থিক জরিমানা ব্যবস্থার আওতায় জরিমানা করা হয়েছে। কারণ তিনি কানাডায় প্রবেশের সময় বহন করা খাদ্য ও প্রাণিজ পণ্যের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ঘোষণা করেননি। কানাডার সীমান্ত আইন অনুযায়ী, বিদেশ থেকে দেশে প্রবেশের সময় যে কোনও খাদ্য, উদ্ভিদ বা প্রাণিজ পণ্য বহন করলে তা অবশ্যই সীমান্ত কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে পণ্য জব্দ হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা এমনকি আইনি ব্যবস্থারও মুখোমুখি হতে হতে পারে।

ডিটেক্টর কুকুর ধারলা ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে CBSA-এর সঙ্গে কাজ করছে। সে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত একটি ক্যানাইন ইউনিটের সদস্য, যারা সীমান্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে। ধারলার মতো প্রশিক্ষিত কুকুর শুধু খাদ্য বা প্রাণিজ পণ্যই নয়, বরং মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র, অবৈধ নগদ অর্থ এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ সামগ্রীও শনাক্ত করতে সক্ষম। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির মতে, এই ক্যানাইন ইউনিট ব্যবহারের ফলে যাত্রী, লাগেজ এবং বাণিজ্যিক পণ্যের স্ক্রিনিং আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, কানাডায় প্রবেশের সময় যাত্রীদের আইন অনুযায়ী নিম্নলিখিত সামগ্রী অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে : সব ধরনের খাদ্যপণ্য, কাঁচা বা রান্না করা মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, ডিম, মাছ ও সামুদ্রিক খাদ্য, প্রাণীর চামড়া বা অন্যান্য প্রাণিজ পণ্য, ফল, শাকসবজি ও বীজ, গাছপালা ও কাঠজাত সামগ্রী, মাটি, ভেষজ উদ্ভিদ, জীবন্ত প্রাণী। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অনেক সময় অতিরিক্ত অনুমতিপত্র বা স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নথিও প্রয়োজন হতে পারে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, কেউ যদি এসব পণ্য ঘোষণা না করেন অথবা প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে ব্যর্থ হন, তাহলে পণ্য জব্দ করা হতে পারে, সর্বোচ্চ ১,৩০০ কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে, গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া যেসব পণ্য কানাডায় প্রবেশের অনুমতি পায় না, সেগুলো ধ্বংস করা, কোয়ারেন্টাইনে রাখা অথবা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার খরচও সংশ্লিষ্ট যাত্রীকেই বহন করতে হতে পারে।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির মতে, অনেক যাত্রীই বুঝতে পারেন না যে বাইরে থেকে আনা খাদ্য, উদ্ভিদ বা প্রাণিজ পণ্যের মাধ্যমে সংক্রামক রোগ, কীটপতঙ্গ কিংবা আক্রমণাত্মক জীবাণু কানাডায় প্রবেশ করতে পারে। এতে শুধু কৃষিখাত নয়, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ, পশুসম্পদ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই সীমান্তে এসব পণ্যের ওপর কঠোর নজরদারি চালানো হয়।

কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি জানিয়েছে, ভ্রমণকারীরা প্রায়ই অজান্তেই যেসব পণ্য ঘোষণা করতে ভুলে যান, তার মধ্যে রয়েছে : বাড়িতে তৈরি খাবার, কাঠের হস্তশিল্প, শুকনো বা রান্না করা মাংস, মাখন, দই ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও সবজি, মাছ ধরার টোপ, ভেষজ ওষুধে ব্যবহৃত উদ্ভিদ, মাটি ও গাছপালা।

সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বিশেষ প্রশিক্ষিত কুকুরও সীমান্ত নিরাপত্তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেক সময় স্ক্যানারে ধরা না পড়লেও কুকুরের ঘ্রাণশক্তি খুব সহজেই লুকিয়ে রাখা খাদ্য বা প্রাণিজ পণ্য শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করছে কানাডায় প্রবেশের সময় সঙ্গে থাকা যেকোনও খাদ্য, প্রাণিজ বা উদ্ভিদজাত পণ্য অবশ্যই ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় শুধু জরিমানাই নয়, আইনি জটিলতায়ও পড়তে হতে পারে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button