বিনিয়োগের নামে ২৬ লাখ ডলার সংগ্রহ, বিলাসবহুল জীবনযাপনে অর্থ অপব্যবহার

আনাস মোহাম্মদ

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে জর্জ হেনরি টায়রার এবং তার প্রতিষ্ঠান মোট ৮৫ জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশে বিদেশি মুদ্রা বিনিয়োগের নামে কোটি কোটি ডলার সংগ্রহ করে সেই অর্থের বড় অংশ ব্যক্তিগত বিলাসিতায় খরচ করার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তি ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। প্রদেশটির আর্থিক বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশন অভিযোগ করেছে, জর্জ হেনরি টায়রার এবং তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ফর দ্য পিপল এফএক্স ইংক. বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২৬ লাখ কানাডিয়ান ডলার সংগ্রহ করলেও সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফরেক্স ট্রেডিংয়ে ব্যবহার করা হয়নি। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের আনা অভিযোগগুলো এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে শুনানি হওয়ার আগে এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে জর্জ হেনরি টায়রার এবং তার প্রতিষ্ঠান মোট ৮৫ জন বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। বিনিয়োগকারীদের বলা হয়েছিল, এই অর্থ আন্তর্জাতিক বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেক্স ট্রেডিংয়ে ব্যবহার করা হবে এবং সেই ট্রেডিং থেকে লাভ করে বিনিয়োগকারীরা উচ্চ মুনাফা পাবেন। কিন্তু তদন্তে কমিশনের দাবি, সংগৃহীত অর্থের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ট্রেডিংয়ের বাইরে অন্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের অন্যতম গুরুতর অভিযোগ হলো, সংগৃহীত অর্থের মধ্যে ৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারেরও বেশি নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আসা টাকা ব্যবহার করে পুরনো বিনিয়োগকারীদের কাছে “লাভের টাকা” হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়েছে। কমিশনের ভাষ্য, এই অর্থকে ট্রেডিং থেকে অর্জিত মুনাফা হিসেবে দেখানো হলেও বাস্তবে তা ট্রেডিংয়ের লাভ ছিল না। অর্থাৎ, নতুন বিনিয়োগকারীর অর্থ দিয়েই পুরনো বিনিয়োগকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

তদন্তে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, টায়রার নিজের ব্যক্তিগত খরচ মেটাতেও বিনিয়োগকারীদের অর্থ ব্যবহার করেছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের তথ্যমতে, ১ লাখ ৭৫ হাজার ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু খরচ হলো : ৬৯,২৪৫ ডলার মূল্যের একটি Rolex ঘড়ি কেনা। নিজের বাড়ির ভাড়া বাবদ ৩১,৭৫০ ডলার পরিশোধ। ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ ও যোগব্যায়ামের জন্য ৯,৩৪৫ ডলার ব্যয়। একটি ট্যাটু করাতে ৩,০০০ ডলার খরচ। এছাড়াও ভ্রমণ, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন খুচরা কেনাকাটার পেছনেও বিনিয়োগকারীদের অর্থ ব্যয় হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে কমিশন।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশন জানিয়েছে, ফর দ্য পিপল এফএক্স কিছু পরিমাণ ফরেক্স ট্রেডিং করেছিল ঠিকই। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ট্রেডিং কার্যক্রমের পরিমাণ ও সাফল্যকে অত্যন্ত বাড়িয়ে উপস্থাপন করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছে এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল যে, বিনিয়োগে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত রিটার্ন পাওয়া সম্ভব। কমিশনের মতে, এ ধরনের নিশ্চয়তা বিভ্রান্তিকর এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশন আরও অভিযোগ করেছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের কাছে একাধিক মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর এবং ভুল তথ্য সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে ছিল : দাবি করা হয়েছিল যে কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ হয়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বলা হয়েছিল BCSC কোম্পানির অর্থ “ফ্রিজ” করে রেখেছে, তবে সেই অর্থ নিরাপদ রয়েছে। অন্তত একজন বিনিয়োগকারীকে এমন একটি অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট দেওয়া হয়, যেখানে তার প্রকৃত অর্থের পরিমাণ সঠিকভাবে দেখানো হয়নি। কমিশনের মতে, এসব তথ্য বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেই দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া কমিশনের অভিযোগ, ৪৮ জন বিনিয়োগকারীর কাছে সিকিউরিটিজ বিক্রি করা হলেও প্রয়োজনীয় প্রসপেক্টাস দাখিল করা হয়নি এবং এ ধরনের ছাড় পাওয়ারও কোনো বৈধ ভিত্তি ছিল না। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশন বলছে, জর্জ হেনরি টায়রার প্রতিষ্ঠানটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এবং কোম্পানির সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তার অনুমোদনেই নেওয়া হতো। তাই কোম্পানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর জন্য তাকেও ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা হয়েছে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, জর্জ হেনরি টায়রার, ফর দ্য পিপল এফএক্স ইংক. অথবা তাদের আইনজীবীকে আগামী ১৮ আগস্ট কমিশনের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এরপর কমিশন আনুষ্ঠানিক শুনানির তারিখ নির্ধারণ করবে এবং সেই শুনানিতে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।

এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিচালিত বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে। আর্থিক বাজারে বৈধ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সাধারণত নির্দিষ্ট লাভের নিশ্চয়তা দেয় না, কারণ ফরেক্সসহ সব ধরনের বাজারই ঝুঁকিপূর্ণ। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সিকিউরিটিজ কমিশনের অভিযোগ যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি শুধু বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনাই নয়, বরং নতুন বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিয়ে পুরনো বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে একটি সম্ভাব্য পনজি-ধাঁচের কার্যক্রমের উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর।

বর্তমানে জর্জ হেনরি টায়রার এবং ফর দ্য পিপল এফএক্স ইংক.-এর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ তদন্ত ও বিচারাধীন রয়েছে এবং আদালত বা সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো অভিযোগ হিসেবেই গণ্য হবে।

Related Articles

Back to top button