এলসিবিওর রাজস্ব কমে ২০০ কোটি ডলারের নিচে

কামরুল ইসলাম

গত সপ্তাহে অন্টারিও সরকারের লিকার কন্ট্রোল বোর্ড (এলসিবিও) এমন এক আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেছে যা প্রদেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।

গত সপ্তাহে অন্টারিও সরকারের লিকার কন্ট্রোল বোর্ড (এলসিবিও) এমন এক আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেছে যা প্রদেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে সরকারি এ লিকার স্টোর চেইন এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০০ কোটি ডলারের কম লভ্যাংশ প্রাদেশিক কোষাগারে জমা দেবে।

এ খবর প্রকাশের পর এ নিয়ে যে বিশ্লেষণগুলো সামনে এসেছে, তার বেশিরভাগই লভ্যাংশ কমে যাওয়ার পেছনে খুচরা বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াকে দায়ী করেছে। অন্টারিও সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী কনভিনিয়েন্স স্টোর, গ্রোসারি চেইন ও বিগ-বক্স স্টোরগুলোতে বিয়ার, ওয়াইন ও রেডি-টু-ড্রিংক (আরটিডি) পানীয় বিক্রির সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে। অনেকের মতে এই বাজার সম্প্রসারণেই এলসিবিওর আয়ের বড় ধাক্কা লেগেছে।

কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। অ্যালকোহল সেবনে কমতি যা স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি বা ক্যানাবিসে কনজাম্পশন বৃদ্ধির কারণে হতে পারে সেটিও একক কারণ নয়। প্রকৃত সমস্যাটি আরো গভীরে, এবং তা অনেকটাই এলসিবিওর অভ্যন্তরীণ দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব সংকটের সঙ্গে জড়িত, যা নিয়ে খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে কথা বলতে চান।

অন্টারিওতে খুচরা পর্যায়ে লিকার বিক্রির সবচেয়ে বড় ও প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রক এলসিবিও। এমনকি বিয়ার–ওয়াইন বিক্রি আংশিক বেসরকারিখাতে যাওয়ার আগ পর্যন্তও তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় ছিল।

তবুও গত কয়েক বছর ধরে এলসিবিওর সরকারকে প্রদত্ত বার্ষিক লভ্যাংশ ক্রমাগত কমছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে যেখানে লভ্যাংশ ছিল ২৪৬ কোটি ডলার, ২০২৪–২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১৮৫ কোটি ডলারে—যা প্রায় ২৫ শতাংশ কম।

বিষয়টি নজর কাড়ায় অনেকে বেসরকারীকরণকে দায়ী করতে চাইছেন। তবে নীতি বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে দোষ তার নয়; বরং এর বড় অংশ আসে এলসিবিওর প্রধান নির্বাহী জর্জ সোলেয়াস এবং পর্ষদের চেয়ার কারমিন নিগ্রোর নেতৃত্বব্যর্থতা থেকে।

এলসিবিওর সমর্থকরা দাবি করছেন, লভ্যাংশ কমার মূল কারণ সরকারের নীতি পরিবর্তন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকার রেস্তোরাঁ ও বারে পাইকারি দরে অ্যালকোহল কেনার সুযোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে অ্যালকোহল এক্সপানশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে খুচরা বিক্রেতাদের জন্যও এই ছাড়ের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়। এই নীতির কারণে এলসিবিওর আয় কমেছে ঠিকই, কিন্তু এই ছাড়ের পরিমাণ মাত্র ১৫–২০ শতাংশ। উপরন্তু, এলসিবিও এখনো অন্টারিওর সবচেয়ে বড় পাইকারি অ্যালকোহল সরবরাহকারী, যার বিক্রি বাজারকে প্রভাবিত করে।

ফলে নীতিমালা আয়ের উপর প্রভাব ফেললেও তা পুরো লভ্যাংশ পতনের ব্যাখ্যা দেয় না।

পরিসংখ্যান বলছে, কানাডিয়ানদের মধ্যে অ্যালকোহল সেবনের প্রবণতা কিছুটা কমেছে। অনেকেই স্বাস্থ্য সচেতনতায় অভ্যাস বদলাচ্ছেন; কেউবা ক্যানাবিসের মতো বৈধ বিকল্পে ঝুঁকছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন বাজারে কিছু প্রভাব ফেললেও এলসিবিওর মতো প্রায়-একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ৬০ কোটি ডলারের বেশি কমে যাওয়ার পূর্ণ ব্যাখ্যা এটি দেয় না।

খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এলসিবিওর শীর্ষ ব্যবস্থাপনা গত কয়েক বছর ধরে আধুনিকায়ন, বাজার বিশ্লেষণ, স্টক ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকসেবা উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করেনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা (সাপ্লাই চেইন), পণ্য বৈচিত্র্য এবং অপারেশনাল স্বচ্ছতা সবখানেই পিছিয়ে আছে এলসিবিও। এ কারণে একটি প্রায়-মনোপলি প্রতিষ্ঠান হয়েও এলসিবিও নিজের বাজার ধরে রাখতে পারছে না যা নেতৃত্বের ব্যর্থতার স্পষ্ট নিদর্শন।

লাভ্যাংশ কমে ২০০ কোটি ডলারের নিচে নামা শুধু সরকারের নীতি পরিবর্তনের ফল নয়। বরং এর বড় অংশ জড়িত এলসিবিওর অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থতার সঙ্গে।

অন্টারিওর জনগণের সামনে এখন বড় প্রশ্ন একটি রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া লিকার ব্যবসা যদি প্রতিযোগিতাবিহীন বাজারেও আয়ের পতন সামাল দিতে না পারে, তবে এর সামনে ভবিষ্যৎ কোন পথে?

Related Articles

Back to top button