কানাডার এভিয়েশন হল অব ফেমে জায়গা পেলেন অং ব্রাদার্স

মুসা বিশ্বাস

চীনা-কানাডিয়ান অং ভাইয়েরা রবার্ট শান অং ও টমি অং প্রথম চীনা-কানাডিয়ান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন কানাডার মর্যাদাপূর্ণ কানাডার এভিয়েশন হল অব ফেমে

কানাডার বিমান চলাচলের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। চীনা-কানাডিয়ান অং ভাইয়েরা রবার্ট শান অং ও টমি অং প্রথম চীনা-কানাডিয়ান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে যাচ্ছেন কানাডার মর্যাদাপূর্ণ কানাডার এভিয়েশন হল অব ফেমে। টরন্টোতে কানাডার বৃহত্তম ফ্লাইট স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং বিমান নির্মাণে অসামান্য অবদানের জন্য তাদের এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।

এশিয়ান হেরিটেজ মাস উপলক্ষে লেখক এভলিন অং তার নতুন বই ‘রিচ ফর দ্য স্কাই: হাউ টু ব্রাদার্স বিল্ট অ্যান এয়ারপ্লেন ইন চায়নাটাউন’-এ তুলে ধরেছেন অং ভাইদের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং আকাশ জয় করার অনন্য কাহিনি। বইটি শুধু দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত যাত্রার গল্প নয়; এটি একইসঙ্গে কানাডায় চীনা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের কঠিন সময় অতিক্রম করে উঠে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক দলিল।

১৯৩০-এর দশকে, যখন মহামন্দার প্রভাবে উত্তর আমেরিকার অর্থনীতি বিপর্যস্ত এবং চীনা বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে সামাজিক বৈষম্য তীব্র ছিল, তখনই বড় হচ্ছিলেন রবার্ট শান অং। সে সময় চীনা-কানাডিয়ানদের জন্য সুযোগ ছিল সীমিত, আর সমাজে তাদের প্রতি ছিল অবহেলা ও সন্দেহের দৃষ্টি।

তবে প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি তরুণ রবার্টকে। উড্ডয়ন ছিল তার আবেগ, আর সেই আবেগই তাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। লেখক এভলিন অং বলেন, অর্থনৈতিক সংকট বা সামাজিক বাধা সত্ত্বেও রবার্টের কৌতূহল ও আকাশের প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে ভিন্ন কিছু করার সাহস জুগিয়েছিল। এমনকি তার এই স্বপ্ন অন্যদেরও সাহায্যের হাত বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া ১২ ভাই-বোনের মধ্যে রবার্ট ও টমি ছিলেন দুজন, যাদের স্বপ্ন ছিল আকাশে ওড়ার। ছোটবেলা থেকেই রবার্ট বিমানের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। বিশেষ করে বিখ্যাত বৈমানিক চার্লস লিন্ডবার্গের এককভাবে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার ঘটনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই সময় বিমান ছিল বিস্ময়ের এক প্রতীক। রবার্ট ম্যাগাজিনে বিমানের ছবি দেখতেন, নকশা অধ্যয়ন করতেন এবং নিজ হাতে ছোট ছোট মডেল বিমান তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে তার শখ পরিণত হয় এক বড় স্বপ্নে।

হাইস্কুলে পড়াকালীন দ্বিতীয় বর্ষেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন সত্যিকারের একটি বিমান তৈরি করবেন। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও তিনি ফোর্ড মডেল গাড়ির ইঞ্জিন ব্যবহার করে বিমান নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। তার কাছে এটি ছিল নিছক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়; বরং ভালোবাসা ও কল্পনার বাস্তব রূপ।

ভ্যানকুভারের চায়নাটাউনে বেড়ে ওঠা রবার্ট নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহায়তা পান। মডেল বিমান তৈরির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ও তার ভাই টমি বাস্তব বিমান নির্মাণ শুরু করেন। সেই সময় চায়নাটাউন ছিল মূলধারার সমাজ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই ছোট সম্প্রদায়ের মধ্যেই জন্ম নেয় এক অসাধারণ উদ্যোগ নিজেদের হাতে বিমান তৈরি।

১৯৩৫ সালে তারা তৈরি করেন “পাইটেনপল স্কাই স্কাউট” নামের বিমান। সেই যুগে সীমিত প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে এমন একটি উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত সাহসী এবং ব্যতিক্রমী। বিমান নির্মাণের এই গল্পই বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে এভলিন অংয়ের বইয়ে।

পরবর্তীকালে অং ভাইয়েরা টরন্টোতে প্রতিষ্ঠা করেন কানাডার অন্যতম বৃহৎ ফ্লাইট স্কুল। তাদের এই উদ্যোগ বহু তরুণ পাইলটের স্বপ্নপূরণের পথ খুলে দেয়। শুধু বিমান নির্মাণ নয়, বিমানচালনা শিক্ষার ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অং ভাইদের অবদান কেবল প্রযুক্তিগত অর্জন নয়; এটি ছিল বর্ণবৈষম্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ। তারা প্রমাণ করেছিলেন, প্রতিভা ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব।

অং ভাইদের কানাডার এভিয়েশন হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্তি শুধু ব্যক্তিগত সম্মান নয়, বরং কানাডার বহুসাংস্কৃতিক ইতিহাসে চীনা-কানাডিয়ান সম্প্রদায়ের অবদানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এভলিন অংয়ের বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন গবেষকরা। রবার্ট ও টমি অংয়ের গল্প মনে করিয়ে দেয় স্বপ্ন কখনও কেবল আকাশে ওড়ে না, বরং প্রতিকূল বাস্তবতাকেও অতিক্রম করে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে।

Related Articles

Back to top button