কানাডা-ভারত সম্পর্ক গভীর করার উদ্যোগ

লিয়াকত আলী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ

দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে ভারত ও কানাডা উভয় দেশেই নতুন হাইকমিশনার নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবারের এই পদক্ষেপকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার ও সহযোগিতা জোরদারের এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরে ভারত ও কানাডার সম্পর্ক নানা সংকটে জর্জরিত। বিশেষ করে কানাডিয়ান মাটিতে ভারতীয় এজেন্টদের বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে বড় ফাটল তৈরি করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশেই একযোগে নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ভারতে কানাডার নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক ক্রিস্টোফার কুটার। তাঁর রয়েছে ৩৫ বছরেরও বেশি কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা। ২৫ বছর আগে তিনি নয়া দিল্লিতে কানাডার কূটনৈতিক দপ্তরে কাজ করেছিলেন, ফলে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ সম্পর্কে তিনি গভীরভাবে অবগত।

কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “ভারতের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ আমাদের সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন যা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে সংযোগ আরও শক্তিশালী করবে।” তিনি আরও বলেন, “কানাডিয়ান নাগরিকদের জন্য কনস্যুলার সেবা পুনরায় সচল করা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।”

অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে যে, কানাডায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন অভিজ্ঞ কূটনীতিক দীনেশ কে. পাটনায়েক। ২০২১ সাল থেকে তিনি স্পেনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

পাটনায়েকের কূটনৈতিক ক্যারিয়ার মূলত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জন-সম্পর্ক এবং বহুপাক্ষিক সংলাপকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে, কানাডার মতো একটি উন্নত দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণে তাঁর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এই নিয়োগের সূত্রপাত আসলে গত জুনে আলবার্টায় অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি-এর মধ্যে একান্ত বৈঠক হয়। বৈঠকে উভয় নেতা কূটনৈতিক নিয়োগ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে একমত হন এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন।

জি৭ সম্মেলনে মোদিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন স্বয়ং মার্ক কার্নি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সেই বৈঠকই দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর সূচনা করেছে।

অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সম্পর্ক নতুন তাৎপর্য বহন করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি তাঁর বৈশ্বিক শুল্কনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছেন। বুধবার ভারতের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে, আর ১ আগস্ট থেকে কানাডার ওপর শুল্ক বাড়বে ৩৫ শতাংশে।

এই চাপের মুখে ভারত ও কানাডা উভয় দেশই নিজেদের বাণিজ্য বৈচিত্র্যময় করতে এবং বিকল্প বাজার তৈরিতে উদ্যোগ নিচ্ছে। ফলে, পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোই এখন উভয়ের অর্থনৈতিক প্রয়োজন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিয়োগ শুধু কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয় এটি ভারত ও কানাডার মধ্যে “বিশ্বাস পুনর্নির্মাণের” প্রতীক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের জন্য কানাডা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার; অপরদিকে কানাডার জন্য ভারত একটি উদীয়মান বাজার ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সম্ভাবনাময় দেশ। ফলে, উভয় দেশের নতুন হাইকমিশনারদের ভূমিকা আগামী দিনে সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ভারত ও কানাডার নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ নিঃসন্দেহে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। রাজনৈতিক উত্তেজনার পর এই কূটনৈতিক অগ্রগতি কেবল পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনেই সহায়ক হবে না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে দক্ষিণ এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে সহযোগিতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করবে।

Related Articles

Back to top button