কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর বেতন বাড়ছে গড়ে ২০%

আলী আহমেদ

কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য গড়ে ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ফেডারেল সরকার।

কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য গড়ে ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ফেডারেল সরকার। প্রতিরক্ষা খাতে গত এক দশকের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে সবচেয়ে বড় এককালীন বিনিয়োগ, যা শুধু আর্থিক দিক থেকেই নয়, সামরিক বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত উন্নয়নেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডেভিড ম্যাকগিনটির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ডিপার্টমেন্ট অব ন্যাশনাল ডিফেন্স এবং কানাডিয়ান আর্মড ফোর্সেস একাধিক বিকল্প বিবেচনা করছে যাতে এই বিশাল বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যায়। লক্ষ্য একটিই নতুন সদস্য আকর্ষণ করা, অভিজ্ঞ সদস্যদের ধরে রাখা এবং উচ্চ চাপের কাজ বা “স্ট্রেস-ট্রেড” পেশাগুলিতে কর্মরত সদস্যদের জন্য বাড়তি প্রণোদনা দেওয়া।

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মুখপাত্র লরেন্ট ডি কাসানভ জানান, এই বৃদ্ধি যেন শুধু কাগজে-কলমে না থাকে, বরং বাস্তবে সদস্যদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং সামরিক বাহিনীকে একটি আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে, সেটিই সরকারের মূল উদ্দেশ্য।

আলোচনাধীন বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে ১) কনিষ্ঠ সদস্যদের প্রারম্ভিক বেতন বৃদ্ধি, যাতে নতুন রিক্রুটরা প্রথম থেকেই আর্থিক সুরক্ষা অনুভব করেন। ২) রিটেনশন বোনাস, যাতে অভিজ্ঞ সদস্যরা বাহিনী ছেড়ে দেওয়ার আগে দ্বিতীয়বার ভাবেন। এবং  ৩) র‌্যাংক ও পেশাভিত্তিক বেতন স্কেল পুনর্গঠন, যা জটিল পে-স্ট্রাকচারে স্বচ্ছতা আনবে।

বর্তমান বেতন কাঠামো অত্যন্ত জটিল। অফিসার এবং নন-কমিশন্ড মেম্বারদের বেতন নির্ধারণ হয় র‌্যাংক, বিশেষায়ন, মোতায়েন এবং অতিরিক্ত দায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে। এছাড়া বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও বিদেশে মোতায়েনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ট্যাক্স-ফ্রি ভাতা যুক্ত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, গড়ে ২০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি মানে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ব্যয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কানাডার প্রতিরক্ষা বাজেটের পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার, যার এক-চতুর্থাংশের বেশি বেতন ও সুবিধা খাতে ব্যয় হবে। অর্থাৎ, নতুন এই উদ্যোগ সামরিক বাজেটের একটি বড় অংশ গ্রাস করবে।

ঘোষণাটি সামরিক সম্প্রদায়ে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি কিছু প্রশ্নও তুলেছে। অনেকে জানতে চাইছেন, এই বেতন বৃদ্ধি কি সবার জন্য সমান হবে, নাকি বিশেষ পেশা ও সংকটময় ট্রেডগুলির জন্য আলাদা থাকবে।

কানাডিয়ান গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের ফেলো শার্লট ডুভাল-ল্যান্টোইন বলেন, “সরকার নানা বিকল্প খতিয়ে দেখছে। তবে এটি সর্বজনীন বেতন বৃদ্ধি নাকি লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।”

ডিপার্টমেন্ট অব ন্যাশনাল ডিফেন্সের সাবেক ন্যায়পাল গ্যারি ওয়ালবোর্ন মন্তব্য করেন, “ঘোষণাটি অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু সদস্যরা জানতে চান তাদের পে-চেক ঠিক কতটা বাড়বে এবং কখন কার্যকর হবে। এই তথ্য ছাড়া তারা ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারছেন না।”

কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনী দীর্ঘদিন ধরেই রিক্রুটমেন্ট ও রিটেনশনের সংকটে ভুগছে। বর্তমানে প্রায় ১৫,০০০ শূন্যপদ রয়েছে, যা মোট কার্যকর সদস্যসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক ক্যারিয়ার ছেড়ে দেওয়ার হার বেড়েছে এবং নতুন রিক্রুটদের প্রশিক্ষণ সম্পন্নের হারও নিম্নমুখী।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বেতন বৃদ্ধি এই সংকটের সমাধান করবে না। কাজের পরিবেশের উন্নতি, পরিবারিক সহায়তা, এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

সরকার জানিয়েছে, চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণের পর ধাপে ধাপে এই বেতন বৃদ্ধি কার্যকর হবে। ২০২৫ সালের শেষার্ধে প্রথম ধাপ এবং ২০২৬ সালের মধ্যে পূর্ণ ২০ শতাংশ বৃদ্ধি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আশা করছে, এই বেতন বৃদ্ধি সদস্যদের আর্থিক স্থিতিশীলতা আনবে এবং কানাডিয়ান সশস্ত্র বাহিনীকে একটি আকর্ষণীয় নিয়োগকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

কানাডার এই উদ্যোগ শুধু একটি আর্থিক পদক্ষেপ নয়; এটি এক ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগ, যা দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তবে ঘোষণার সাফল্য নির্ভর করবে কীভাবে সরকার এই বৃদ্ধি বাস্তবায়ন করে এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যা যেমন কাজের পরিবেশ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।

Related Articles

Back to top button