বকশিশ সংস্কৃতির বিলুপ্তি চান দুই-তৃতীয়াংশ কানাডিয়ান

মুসা বিশ্বাস

দেশটির বিপুল সংখ্যক নাগরিক মনে করছেন বকশিশ প্রথা এখন তার সীমা অতিক্রম করেছে এবং এটি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে

কানাডায় বকশিশ বা টিপস সংস্কৃতি নিয়ে জনমতের একটি বড় পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক জাতীয় সমীক্ষা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশটির বিপুল সংখ্যক নাগরিক মনে করছেন বকশিশ প্রথা এখন তার সীমা অতিক্রম করেছে এবং এটি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এইচঅ্যান্ডবি ব্ল্যাক কানাডার ২০২৬ সালের গবেষণা অনুযায়ী, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬৭ শতাংশ কানাডিয়ান মনে করেন, বকশিশ সংস্কৃতির অবসানের সময় এসে গেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমে বকশিশের প্রম্পট ক্রমশ বাড়তে থাকায় মানুষের বিরক্তি তীব্র হয়েছে।

সমীক্ষার ফলাফল বলছে, ৯৩ শতাংশ কানাডিয়ান এমন পরিস্থিতিতে বিরক্ত হন, যেখানে স্বাভাবিকভাবে বকশিশ দেওয়ার কোনো প্রত্যাশা থাকে না তবুও পেমেন্ট মেশিনে বকশিশের অপশন দেখানো হয়। উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ফাস্ট-ফুড কাউন্টার, কনভিনিয়েন্স স্টোর এবং সেল্ফ-সার্ভিস কিয়োস্কের মতো জায়গাগুলো। এসব ক্ষেত্রে গ্রাহকরা মনে করছেন, বকশিশ এখন আর স্বেচ্ছাসেবী কৃতজ্ঞতার প্রকাশ নয়, বরং একপ্রকার চাপিয়ে দেওয়া প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একইসঙ্গে ৯৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বকশিশ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ, এটি আর সেবার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নেই; বরং এটি এক ধরনের সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে।

এই অসন্তোষ ভোক্তা আচরণেও প্রভাব ফেলছে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ কানাডিয়ান সেইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, যারা নিয়মিত বা আগ্রাসীভাবে বকশিশের প্রম্পট দেয়। শুধু তাই নয়, ৪১ শতাংশ মানুষ এমন প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেন। এটি ব্যবসার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বকশিশের পরিমাণ নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। ৮৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, বর্তমান বকশিশের হার অত্যধিক বেশি। ফলে অনেকেই এখন বকশিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন।

সমীক্ষায় অংশ নেওয়া কানাডিয়ানদের মানসিকতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৭ শতাংশ নিজেদেরকে “হিসাবি বকশিশদাতা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা সাধারণত কম বকশিশ দেন অথবা শুধুমাত্র অসাধারণ সেবার ক্ষেত্রে বকশিশ দিতে আগ্রহী। অন্যদিকে, ৩৬ শতাংশ নিজেদেরকে “উদার বকশিশদাতা” হিসেবে বিবেচনা করেন, যারা তুলনামূলক বেশি হারে বকশিশ দেন বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি প্রদান করেন।

১৯ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত এই সমীক্ষায় মোট ১,৫৪৫ জন কানাডিয়ান অংশগ্রহণ করেন, যা দেশের সামগ্রিক জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা শুধু কানাডায় সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বজুড়েই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বকশিশ সংস্কৃতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে বকশিশ কি এখনও স্বেচ্ছায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম, নাকি এটি ধীরে ধীরে বাধ্যতামূলক অর্থনৈতিক আচরণে পরিণত হচ্ছে?

সমীক্ষার ফলাফল একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে কানাডিয়ানদের একটি বড় অংশ এখন বকশিশ সংস্কার বা পুনর্বিবেচনার পক্ষে। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে নীতিগত বা ব্যবসায়িক পরিবর্তন আসতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

Related Articles

Back to top button