মদের মূল্যবৃদ্ধি পরিকল্পনা ঘিরে নথি গোপনের অভিযোগ

কামরুল ইসলাম

প্রাদেশিক সরকারের মদ্যপ পানীয়ের মূল্য কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে

অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের মদ্যপ পানীয়ের মূল্য কাঠামো পরিবর্তনের পরিকল্পনা ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিপত্র প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দেওয়ায় সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রীর দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তথ্য অধিকার আইনের আওতায় চাওয়া নথিগুলো সংগ্রহ ও যাচাইয়ের কাজ অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। তাদের দাবি, বিপুল পরিমাণ তথ্য খুঁজে বের করা এবং তা যাচাই-বাছাই করার জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। ফলে নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে অনেক পরে এসব নথি প্রকাশ করা হবে।

উল্লেখ্য, এই নথিগুলোর জন্য আবেদন করা হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের আবেদনের জবাব এক মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন ধাপে সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ জানানো হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে যা প্রায় এক বছরেরও বেশি বিলম্ব। এই অস্বাভাবিক সময়ক্ষেপণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তুলেছে পর্যবেক্ষক ও সমালোচকদের মধ্যে। তাদের মতে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য প্রকাশে এত দীর্ঘ বিলম্ব গ্রহণযোগ্য নয়।

বিতর্কের শুরু ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে, যখন অন্টারিও সরকার মদ্য বিক্রয় ব্যবস্থায় পাইকারি মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ঘোষণা দেয়। এর আগে ২০২৪ সালে প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড মদ্যপ পানীয় আরও বেশি খুচরা দোকান ও বিপণিতে বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন। একই সঙ্গে মূল্য কাঠামোকে সহজ ও ন্যায্য করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। সরকারের এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কর ও ফি–সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা এবং ভোক্তাদের জন্য বাজারকে আরও সহজ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

তবে প্রস্তাবিত নতুন মূল্য কাঠামো সামনে আসার পরই শিল্পখাতের বিভিন্ন অংশ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, পানশালা এবং রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, এই পরিবর্তনের ফলে খুচরা বাজারে বিয়ারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারত। তাদের হিসাব অনুযায়ী, একটি বিয়ারের বাক্সের দাম কয়েক ডলার পর্যন্ত বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। শুধু তাই নয়, পানশালায় এক গ্লাস বিয়ারের দামও বাড়তে পারত। পাশাপাশি শক্ত মদ ও ওয়াইনের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত মূল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

এই তীব্র সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের নভেম্বরে সরকার প্রস্তাবটি স্থগিত করে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার কথা জানানো হয়। পরে একটি সংশোধিত পরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। তবে সেই সংশোধিত পরিকল্পনার বিস্তারিত এবং এর পেছনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো তথ্য সামনে আসেনি যা বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা আবেদনের ক্ষেত্রে বারবার সময় বাড়ানো, অনুসন্ধান ব্যয়ের দাবি এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অজুহাত দেখানো এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা। তাদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ সরকারের তথ্য গোপন করার প্রবণতার ইঙ্গিত হতে পারে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি খুঁজে বের করে সেগুলো যাচাই করতে সময় লাগছে। আইন অনুযায়ী সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ থাকায় সেই পথই অনুসরণ করা হচ্ছে।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের দাবি, প্রাদেশিক মদ্য বিক্রয় সংস্থা আগে মূল্য কাঠামো সহজ করার জন্য একাধিক বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সেগুলো পাশ কাটিয়ে ভিন্ন একটি মডেল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, যা পরবর্তীতে শিল্পখাতে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মদ্যপ পণ্যের মূল্য নির্ধারণের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। তারা মনে করছেন, এই বিষয়ে দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ না করলে জনমনে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে এবং সরকারের প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্টারিও সরকারের মদ্যপ পানীয়ের মূল্য কাঠামো পরিবর্তন নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন শুধু অর্থনৈতিক বা নীতিগত প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

Related Articles

Back to top button