সংকটের মুখে আছে কানাডার অভিবাসন ব্যবস্থা

লিয়াকত আলী

অভিবাসনমন্ত্রী লেনা দিয়াবে

কানাডায় সম্প্রতি অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচি (Temporary Foreign Worker Program – TFWP) বাতিলের দাবি উঠলেও, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন দি কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্স জানিয়েছে, এ দাবি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পুরো ব্যবস্থাটি নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

চেম্বারটি গত সপ্তাহে ফেডারেল কর্মসংস্থান ও অভিবাসন মন্ত্রীদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলেছে, উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্বের সঙ্গে অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচির সম্পর্ক খুবই দুর্বল। অর্থাৎ, বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি স্থানীয় তরুণদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে এমন ধারণা তথ্যনির্ভর নয়।

চেম্বারের ফিউচার অব ওয়ার্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ডায়ানা পালমেরিন-ভেলাস্কো বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের বেকারত্ব ও অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচি নিয়ে ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে চেম্বারটি সরকারকে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে চিঠি পাঠিয়েছে।

তিনি বলেন, “আমরা চিঠিটি পাঠিয়েছি কারণ আমরা মনে করি, বর্তমান অভিবাসন ব্যবস্থা একপ্রকার সংকটের মুখে রয়েছে। এটা কারো জন্যই ভালোভাবে কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না না অভিবাসীদের জন্য, না নিয়োগদাতাদের জন্য। পুরো ব্যবস্থাই এখন অত্যন্ত জটিল ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।”

পালমেরিন-ভেলাস্কো আরও বলেন, কানাডার অর্থনীতি অভিবাসনের ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু বর্তমানে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে মানুষ অভিবাসনের গুরুত্ব ভুলে যাচ্ছে।

চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণরা সাধারণত যেসব চাকরির জন্য আবেদন করেন না, সেই পদগুলোতেই অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিকরা কাজ করেন। এই চাকরিগুলো সাধারণত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে কাজের সময়সূচি অনিয়মিত এবং রাতের বেলা কাজ করতে হয়।

তিনি উল্লেখ করেন, “যুব সমাজ যেসব কাজকে আকর্ষণীয় মনে করে না, সেসব ক্ষেত্রেই অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে, তাদের কারণে স্থানীয় তরুণদের চাকরির সুযোগ কমছে এমন বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।”

চেম্বার জানায়, কানাডার বেশ কয়েকটি খাত বহুদিন ধরে অবিরাম শ্রমিক সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে রয়েছে – কৃষি, নির্মাণ, অ্যাকোমোডেশন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং খাদ্য সেবা। এই খাতগুলোতে স্থানীয় শ্রমিকের ঘাটতি এতটাই প্রকট যে, বিদেশি কর্মী ছাড়া উৎপাদন ও সেবা খাত স্থবির হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অভিবাসনমন্ত্রী লেনা দিয়াবের কার্যালয় থেকে পাঠানো এক ইমেইল বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট ৩৯,১৫০ জন অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কানাডায় এসেছেন। এই বছর সরকার মোট ৮২,০০০ জন অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট মাসে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কানাডীয় তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৪.৫ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডা এখন এক দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে – একদিকে, তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বাড়ছে; অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।

এ অবস্থায় অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচি বাতিল নয়, বরং এর সংস্কার প্রয়োজন। একটি স্বচ্ছ, ভারসাম্যপূর্ণ ও তথ্যভিত্তিক নীতির মাধ্যমে যেমন স্থানীয় শ্রমিকদের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব, তেমনি দেশের অর্থনীতির চাহিদাও পূরণ করা যাবে।

অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠলেও, দি কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের দাবি এটি কানাডার অর্থনীতির এক অপরিহার্য অংশ। তরুণদের বেকারত্বের দায় বিদেশি শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে, সরকার ও সমাজের উচিত হবে পুরো অভিবাসন ব্যবস্থার গঠনমূলক পুনর্মূল্যায়ন করা।

Related Articles

Back to top button