ইরান যুদ্ধ যেভাবে কানাডিয়ানদের ক্ষতি করতে পারে

জুমু চৌধুরী

কার্লেটন ইউনিভার্সিটির প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্টিফেন সাইডম্যানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তিনি বলেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বৈশ্বিক অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং এর প্রতিক্রিয়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো কানাডার অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কার্লেটন ইউনিভার্সিটির প্রতিরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্টিফেন সাইডম্যানের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তিনি বলেন, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং সন্ত্রাসবাদ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর মতে, “এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু একবার সংঘাত শুরু হয়ে গেলে এর প্রভাব বহু দেশকেই বহন করতে হয়।”

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সরু সামুদ্রিক পথটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি ইতিমধ্যেই দিয়েছে ইরান।

যদি হরমুজ প্রণালীতে পরিবহন ব্যাহত হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে গিয়ে দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডার অপরিশোধিত তেলের চাহিদা বাড়তে পারে, যা দেশের জ্বালানি খাতকে স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। এতে কানাডিয়ান ডলারও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে এর বিপরীতে সাধারণ ভোক্তাদের জন্য জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। পেট্রোল, গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে তা সরাসরি পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিতে পারে, যার ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কার্লেটন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফেন ওসলার হ্যাম্পসন সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শীতকালীন কৃষি মৌসুমের প্রস্তুতি চলছে। যুদ্ধের কারণে যদি সার, পেট্রোকেমিক্যাল এবং জ্বালানির সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তবে তা কৃষি উৎপাদনের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, “কৃষি উৎপাদনের জন্য জ্বালানি ও রাসায়নিক সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের কারণে যদি এই সরবরাহ ব্যাহত হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে।” এতে কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের খাদ্য বাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব কৃষক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার বা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মুখে পড়তে পারেন।

ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার অধ্যাপক এবং ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থমাস জুনোর মতে, এই সংঘাত কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রতিক্রিয়াও থাকতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরানের সরকার যদি আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তবে তারা প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ নিতে পারে, যার মধ্যে আন্তঃদেশীয় হুমকির ঘটনাও থাকতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কানাডার মতো দেশগুলোকেও সতর্ক থাকতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে অধ্যাপক হ্যাম্পসন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, ইরানের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি হলে সেখানে বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী ও মিলিশিয়াদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে। এই ধরনের অস্থিরতা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ কানাডায় বসবাস করেন। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি আরও তীব্র হয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া কানাডার অভ্যন্তরেও সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা হিসেবে প্রতিফলিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকির জন্য প্রস্তুত থাকা কানাডার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা যদি বড় আকারের সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই নয়—বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কানাডার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দ্বিমুখী হতে পারে। একদিকে জ্বালানি রপ্তানিতে কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা আসতে পারে, অন্যদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, খাদ্য সরবরাহের চাপ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি দেশের অর্থনীতি ও সমাজে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা তাই মনে করছেন, এই সংঘাতের গতিপ্রকৃতি আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Related Articles

Back to top button