গাড়ি ছিনতাই থেকে বিদেশে পাচার—জিটিএতে ভয়ংকর চক্র ভেঙে গ্রেপ্তার ৬

জুমু চৌধুরী

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত মিসিসাগা ও টরন্টোর বিভিন্ন পার্কিং এলাকায় একই ধরনের একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে

গ্রেটার টরন্টো এলাকায় ধারাবাহিক সশস্ত্র গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত তদন্ত ও অভিযানের মাধ্যমে চক্রটির ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মোট ৩০টি গুরুতর অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির শুরু পর্যন্ত মিসিসাগা ও টরন্টোর বিভিন্ন পার্কিং এলাকায় একই ধরনের একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। প্রতিটি ঘটনার কৌশল ছিল প্রায় অভিন্ন দুইজন সশস্ত্র ব্যক্তি আচমকা গাড়ির মালিকদের মুখোমুখি হয়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নিত এবং মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল ত্যাগ করত। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের জোর করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়, যা ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে তোলে।

এই ধারাবাহিক ঘটনার প্রেক্ষিতে পুলিশ একটি সমন্বিত তদন্ত শুরু করে। তদন্তে উঠে আসে, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; বরং একটি সুসংগঠিত ও পরিকল্পিত চক্র দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অপরাধ পরিচালনা করে আসছিল। চক্রটি মূলত উচ্চমূল্যের ব্যক্তিগত গাড়ি, বিশেষ করে মার্সিডিজ-বেঞ্জ ব্র্যান্ডের বিভিন্ন মডেলকে লক্ষ্যবস্তু বানাতো।

তদন্তে আরও জানা যায়, ছিনতাইয়ের পর গাড়িগুলোর প্রকৃত পরিচয় গোপন করতে নম্বরপ্লেট ও নথিপত্র পরিবর্তন করা হতো। এরপর সেগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সরিয়ে রাখা হতো, যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়। পরবর্তীতে এসব গাড়ি বিদেশে পাচারের জন্য প্রস্তুত করা হতো, যা থেকে চক্রটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

অভিযানের একপর্যায়ে পুলিশ গ্রেটার টরন্টো অঞ্চলের বিভিন্ন গোপন স্থানের সন্ধান পায়। কোথাও ভাড়া করা সংরক্ষণ কক্ষে গাড়ি রাখা ছিল, কোথাও আবার মেরামতের ওয়ার্কশপ ব্যবহার করা হচ্ছিল। কিছু গাড়ি ইতোমধ্যেই শিপিং কনটেইনারে তোলা হয়েছিল বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। এসব স্থান থেকে অন্তত আটটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলোর মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় আট লাখ ডলার।

তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে টরন্টোর একটি গাড়ি মেরামতের স্থানে অভিযান চালানোর সময়। সেখানে একটি ছিনতাই হওয়া গাড়ি উদ্ধার করা হয়, যার পরিচয় ইতোমধ্যে পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং বিদেশে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত ছিল। এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা আরও কয়েকটি শিপিং কনটেইনার শনাক্ত করেন এবং তল্লাশি চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেন।

অভিযানের সময় টরন্টোর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা বিদেশগামী একটি বিমানে ওঠার চেষ্টা করছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশ ধারণা করছে, চক্রটির কার্যক্রম শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাড়ি পাচারের পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হতো।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত সংগঠিতভাবে কাজ করত। ছিনতাই থেকে শুরু করে গাড়ি গোপন রাখা, পরিচয় পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশে পাচার প্রতিটি ধাপ ছিল সুপরিকল্পিত। বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করলেও পুরো কার্যক্রম একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আওতায় পরিচালিত হতো।

গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে টরন্টো, ব্র্যাম্পটন এবং অন্টারিওর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চুরি, প্রতারণা এবং অপরাধে সহযোগিতাসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, এই অভিযানের মাধ্যমে একটি সহিংস ও সুসংগঠিত অপরাধচক্রকে বড় ধাক্কা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের অপরাধ দমনে জনগণের সচেতনতা, দ্রুত তথ্য প্রদান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।

Related Articles

Back to top button