দেড় দশক পর নাটকীয় মোড়, সন্তান নিয়ে পালানো মাকে গ্রেপ্তার, আদালতে হাজির

জামির হোসেন

প্রায় সতেরো বছর আগে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর সন্তান অপহরণ মামলায় অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

প্রায় সতেরো বছর আগে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর সন্তান অপহরণ মামলায় অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বহুদিন ধরে পলাতক থাকার পর অভিযুক্ত এক নারীকে ইউরোপ থেকে আটক করা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি কানাডার অন্টারিও প্রদেশের নিউমার্কেট আদালতে ভার্চুয়ালভাবে হাজিরা দিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের এই মামলার পুনরুজ্জীবন নতুন করে আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব সংক্রান্ত আইন ও জটিলতা নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

৫২ বছর বয়সী ওই নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আদালতের নির্দেশ অমান্য করে নিজের দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানকে যাদের বয়স তখন ১৪ বছরের নিচে অবৈধভাবে নিয়ে যান। আদালত ইতোমধ্যে শিশুদের পূর্ণ অভিভাবকত্ব তাদের বাবার হাতে ন্যস্ত করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সাক্ষাৎ-সুবিধার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি পরিকল্পিতভাবে সন্তানদের নিয়ে দেশ ছাড়েন।

তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার নির্ধারিত সময়েই তিনি প্রথমে সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং পরে ইউরোপের একটি দেশে আশ্রয় নেন। এই পালানোর পরিকল্পনায় পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় তাকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে ওই আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং তিনি শাস্তিও ভোগ করেন।

অন্যদিকে, সন্তানদের বাবা হাল ছাড়েননি। তিনি বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশে আইনি লড়াই চালিয়ে যান সন্তানদের ফিরিয়ে আনার জন্য। কয়েক বছর পর তিনি সন্তানদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হন। তবে স্থানীয় আদালত শিশুদের কানাডায় ফেরত পাঠানোর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। আদালতের যুক্তি ছিল শিশুরা নতুন পরিবেশে ইতোমধ্যে মানিয়ে নিয়েছে, তাই হঠাৎ করে তাদের স্থানান্তর তাদের মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এই সিদ্ধান্ত মামলাটিকে আরও জটিল করে তোলে। আন্তর্জাতিক আইন, ভিন্ন দেশের বিচারব্যবস্থা এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ এই তিনের সমন্বয়েই বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় জড়িয়ে পড়ে।

এরপর থেকেই অভিযুক্ত নারীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল। তাকে বহু বছর ধরে “সর্বাধিক খোঁজ করা আসামি” তালিকায় রাখা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতা, প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত বাধা এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপের একটি দেশে তাকে আটক করা হলে মামলাটি আবার সামনে আসে। এখন তাকে কানাডায় বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা হচ্ছে।

বর্তমানে ওই দুই সন্তানই প্রাপ্তবয়স্ক। তারা কানাডায় ফিরে এসেছে কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আদালত ইতোমধ্যেই অভিযুক্ত নারীর ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। তাকে সন্তানদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এই ঘটনা শুধু একটি পুরনো মামলার অগ্রগতি নয়, বরং এটি একটি বড় বার্তা বহন করে যখন অভিভাবকত্বের বিরোধ আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে, তখন তা আইনি, মানবিক এবং সামাজিকভাবে কতটা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেখায়, সময় যতই পেরিয়ে যাক, আইন তার গতিতে এগিয়ে চলে এবং বিচার প্রক্রিয়া একসময় না একসময় সামনে আসেই।

Related Articles

Back to top button