দুই ঘণ্টার বেশি পর্দা-ব্যবহারেই ঝুঁকি

আলী আহমেদ

ডিজিটাল যুগে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে পর্দার (স্ক্রিন) উপস্থিতি এখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী

ডিজিটাল যুগে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে পর্দার (স্ক্রিন) উপস্থিতি এখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী। তবে এই ব্যবহারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা কতটা জরুরি, তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক এক দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, যারা নিয়ম মেনে পর্দা ব্যবহার করে, তারা শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা, ঘুম, আচরণ এবং শিক্ষাগত ফলাফলে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে থাকে।

এই বিশ্লেষণে একই শিশুদের কয়েক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। প্রথমে তারা ছিল ছোট বয়সে, পরে কৈশোরে পৌঁছানোর পর তাদের অবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। দেখা যায়, প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু ধারাবাহিকভাবে নির্ধারিত স্ক্রিন-সময়ের সীমা মেনে চলেছে। অন্যদিকে, ১২ শতাংশ শিশু কখনোই সেই সীমা অনুসরণ করেনি।

যেসব শিশু নিয়ম মেনে পর্দা ব্যবহার করেছে, তাদের মধ্যে ৯১.৩ শতাংশ নিজেদের স্বাস্থ্যকে খুব ভালো বা চমৎকার হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিপরীতে, সীমা না মানা শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৮১.৯ শতাংশে নেমে আসে।

মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পার্থক্য আরও স্পষ্ট। সীমার মধ্যে থাকা শিশুদের ৮০ শতাংশ নিজেদের মানসিক অবস্থা ভালো বলেছে, যেখানে অন্যদের ক্ষেত্রে এই হার ৬৬.৯ শতাংশ। উদ্বেগ বা অস্থিরতার লক্ষণ না থাকার হারও তুলনামূলক বেশি ২১.৯ শতাংশ বনাম ১৭.৮ শতাংশ। একইভাবে হতাশার লক্ষণ না থাকার ক্ষেত্রেও সীমা মানা শিশুদের হার (৪৫.৪%) অন্যদের তুলনায় (৩৭.৭%) বেশি।

শারীরিক সমস্যার ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান স্পষ্ট। গত ছয় মাসে মাথাব্যথার অভিযোগ করেনি এমন শিশুদের হার সীমা মানা দলের মধ্যে ৬৯.৩ শতাংশ, যেখানে অন্যদের মধ্যে তা ৫২.৬ শতাংশ। ঘুমের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা ৬৫.৬ শতাংশ শিশু সহজে ঘুমাতে পেরেছে, কিন্তু সীমা না মানা শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৫২.৮ শতাংশ। পড়াশোনায়ও এগিয়ে রয়েছে সীমা মেনে চলা শিশুরা। তাদের ৯০.৬ শতাংশের ফলাফল ৭০ শতাংশ বা তার বেশি, যেখানে অন্যদের মধ্যে এই হার ৮৬.২ শতাংশ।

আচরণগত সমস্যার ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য দেখা যায়। উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছে সীমা মানা শিশুদের মাত্র ৩.২ শতাংশ, কিন্তু সীমা না মানা শিশুদের মধ্যে এই হার ৬.৬ শতাংশ। আচরণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা (৫.৩% বনাম ১০.৯%) এবং বন্ধু তৈরি করতে অসুবিধা (৪.৮% বনাম ৮.২%) সব ক্ষেত্রেই সীমা মানা শিশুরা এগিয়ে। স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমা না মানা শিশুদের সমস্যা বেশি। যথাক্রমে ৯.৮%, ৫.৪% এবং ৯.৪% শিশু এসব সমস্যায় ভুগেছে। অন্যদিকে সীমা মানা শিশুদের মধ্যে এই হার তুলনামূলকভাবে কম ৭.২%, ৪.৮% এবং ৬.৮%।

চোখের সমস্যার ক্ষেত্রেও পার্থক্য রয়েছে। চশমা বা কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করতে হয়েছে সীমা মানা শিশুদের ২৫.৪ শতাংশকে, যেখানে সীমা না মানা শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩২.১ শতাংশ। সবচেয়ে বড় ব্যবধানটি দেখা গেছে রাতের অভ্যাসে। সীমা না মানা শিশুদের ৬৩.৯ শতাংশ ঘুমানোর আগে শোবার ঘরে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করেছে। অন্যদিকে সীমা মেনে চলা শিশুদের মধ্যে এই হার মাত্র ২৩.৮ শতাংশ।

একটি ভিন্ন দিকও উঠে এসেছে এই বিশ্লেষণে। সীমা না মানা শিশুদের মধ্যে ৮৮.১ শতাংশ অন্তত একবার অভিভাবকের সঙ্গে অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেছে, যা সীমা মানা শিশুদের ক্ষেত্রে ৮২.৬ শতাংশ। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তবে অভিভাবকের নজরদারিতে এগিয়ে রয়েছে সীমা মানা শিশুরাই। তাদের ক্ষেত্রে ৮৮.১ শতাংশ অভিভাবক সন্তানের অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত অবগত, যেখানে সীমা না মানা শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৭২.৫ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তি এখন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে না রাখলে শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই পরিমিত স্ক্রিন-টাইম, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং বিকল্প স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এই বিশ্লেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় পর্দা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই শিশুদের সুস্থ বিকাশের মূল চাবিকাঠি।

Related Articles

Back to top button