ইরানের বিরুদ্ধে হামলাকে সমর্থন দিয়ে কি অনেক দূর এগিয়েছেন কার্নি?

জুমু চৌধুরী

আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থির প্রেক্ষাপটে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে পড়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থির প্রেক্ষাপটে আবারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে পড়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তাঁকে একাধিক জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সর্বশেষ বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে, যা ইরানের বিরুদ্ধে গত সপ্তাহান্তে শুরু হয়।

এই প্রেক্ষাপটে কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী কার্নি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দের নামে ছয় অনুচ্ছেদের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিটি প্রকাশের পরপরই তা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে এর ভাষা ও অবস্থান নিয়ে।

বিবৃতির প্রথমাংশে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে কানাডার দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও সমালোচনা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে তার ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার প্রতি সম্ভাব্য হুমকির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিবৃতির পঞ্চম অনুচ্ছেদ, যেখানে বলা হয়েছে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এবং বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে কানাডা সমর্থন করে। এই বক্তব্য অনেকের কাছেই সরাসরি সামরিক অভিযানের প্রতি সমর্থন হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।

একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকারও। তবে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সংযত। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির যৌথ বিবৃতিতে সামরিক পদক্ষেপের সরাসরি সমর্থন না দিয়ে বরং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই পার্থক্য থেকেই প্রশ্ন উঠছে কানাডা কি তার ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক ভারসাম্য থেকে সরে যাচ্ছে?

সমালোচকরা বলছেন, কানাডার বর্তমান অবস্থান অতীতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উদাহরণ হিসেবে ভেনিজুয়েলা ইস্যুর কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নিয়ে কানাডা অনেক বেশি সতর্ক অবস্থান নিয়েছিল। অথচ ইরান ইস্যুতে বিবৃতির শেষাংশে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই দ্বৈততা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সমালোচনা কেবল বিরোধী দল থেকেই নয়, বরং ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির ভেতর থেকেও এসেছে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অ্যাক্সওয়ার্দি এক মতামত নিবন্ধে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণে কানাডার সমর্থন না দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান অবস্থানের তুলনা করেছেন। তাঁর মতে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপকে জাতিসংঘ সনদের আওতায় বৈধতা দেওয়া কঠিন, অথচ বর্তমান বিবৃতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকটি উপেক্ষিত হয়েছে।

অ্যাক্সওয়ার্দি আরও উল্লেখ করেন, বিষয়টি কেবল ইরানকে ঘিরেই নয়; বরং এটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার প্রশ্ন। তিনি ইঙ্গিত করেন যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে একাধিক দেশে একতরফা শক্তি প্রয়োগের নজির তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করেছে। একই সুরে সমালোচনা করেছেন লিবারেল এমপি উইল গ্রিভস, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী কার্নি এখনো পর্যন্ত এই বিতর্কিত বিবৃতি নিয়ে সরাসরি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি। তবে তাঁর সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা শিগগিরই এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, পরিস্থিতিটি কার্নির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন এবং কানাডার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ঐতিহ্য রক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ইরান ইস্যুতে কানাডার এই অবস্থান শুধুমাত্র একটি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং এটি দেশটির বৈদেশিক নীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনারও ইঙ্গিত বহন করে। আগামী দিনে কার্নি সরকার এই অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করে, সংশোধন করে কিংবা আরও দৃঢ় করে সেটিই এখন নজরে রাখছে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

Related Articles

Back to top button