সহিংস চরমপন্থা প্রতিরোধ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে

মাসুদ করিম

তরুণদের মধ্যে চরমপন্থার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস

কানাডায় তরুণদের মধ্যে চরমপন্থার বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা কানাডিয়ান সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন। ২০২৫ সালের বর্ষশেষ মূল্যায়নে সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের সন্ত্রাসবাদবিরোধী তদন্তে ক্রমশ বাড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পৃক্ততা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই তদন্তের আওতায় আসা কিছু কিশোরের বয়স মাত্র ১৩ বছর।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিএসআইএস পরিচালিত প্রতি ১০টি সন্ত্রাসবাদবিরোধী তদন্তের অন্তত একটিতে ১৮ বছরের নিচের একজন বা একাধিক ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি এখন একটি ধারাবাহিক প্রবণতায় রূপ নিয়েছে, যা কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কমিউনিটির মাধ্যমে তরুণরা এমন সব কনটেন্টের নাগাল পাচ্ছে, যা সহিংসতা, উগ্রবাদ কিংবা চরমপন্থী মতাদর্শকে স্বাভাবিক ও আকর্ষণীয় হিসেবে তুলে ধরছে।

এই প্রবণতা অপ্রত্যাশিত নয়, তবে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন গবেষকের ভাষায়, “এটা বিস্ময়কর নয়, কারণ আমরা বহু বছর ধরেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উগ্রবাদী কনটেন্টের বিস্তার দেখছি। কিন্তু বিষয়টি আতঙ্কজনক, কারণ এখন খুব অল্প বয়সী তরুণরাও সহজেই এসব নেটওয়ার্কের প্রভাবের মধ্যে চলে যাচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ের তরুণরা তাদের জীবনের বড় একটি অংশ অনলাইনে কাটায়। তারা কী ধরনের ভিডিও দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন মতাদর্শ অনুসরণ করছে এসব বিষয় তাদের মানসিক ও সামাজিক আচরণে গভীর প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কিশোররা অনলাইনে পরিচিত হওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে সহিংস মতাদর্শে প্রভাবিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।

সিএসআইএসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তরুণদের মধ্যে “আইডিওলজিক্যালি মোটিভেটেড ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম” (আইএমভিই) এবং “রিলিজিয়াসলি মোটিভেটেড ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম” (আরএমভিই)-সংক্রান্ত কনটেন্টে প্রবেশের সুযোগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক, বর্ণবাদী কিংবা ধর্মীয় উগ্র মতাদর্শভিত্তিক সহিংস কনটেন্ট এখন তরুণদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো : অনলাইনে কোনো কিশোর কেবল কৌতূহলবশত এসব কনটেন্ট দেখছে, নাকি বাস্তবিকভাবে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকছে, সেটি নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। কারণ, অনেক সময় উগ্রবাদী প্রচারণা সরাসরি সহিংসতার আহ্বান না জানিয়ে ধীরে ধীরে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তার করে। ফলে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, করোনা-পরবর্তী সময়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, পরিচয় সংকট এবং অনলাইনে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তরুণদের একটি অংশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। যারা নিজেদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে বা হতাশায় ভোগে, তারা অনেক সময় অনলাইন উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর কাছে সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে। এসব গোষ্ঠী বন্ধুত্ব, গ্রহণযোগ্যতা কিংবা উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।

প্রতিবেদনটি কানাডার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অভিভাবক এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং পরিবার, স্কুল, সামাজিক সংগঠন এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালগরিদমভিত্তিক কনটেন্ট সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, একজন তরুণ একবার উগ্রবাদী বা সহিংস কোনো ভিডিও দেখলে, পরবর্তীতে একই ধরনের আরও কনটেন্ট তার সামনে আসতে থাকে। এতে ধীরে ধীরে সে একটি “ইকো চেম্বার”-এর মধ্যে আটকে যায়, যেখানে বিকল্প মতামত বা বাস্তবতার সঙ্গে তার সংযোগ কমে আসে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, তরুণদের চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার এই প্রবণতা যদি এখনই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি কানাডার সামাজিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এবং তরুণদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button