পার্কসাইড ড্রাইভে গাড়ির গতি বেড়েছে ২০০%

মাসুদ করিম

যদিও স্পিড ক্যামেরা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তথাপি সিটির “ওয়াচ ইয়র স্পিড” সাইন এখনো গাড়ির গতি রেকর্ড করে যাচ্ছে

কানাডার টরন্টোর ব্যস্ত পার্কসাইড ড্রাইভে আবারও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অন্টারিও সরকারের অটোমেটেড স্পিড এনফোর্সমেন্ট বা স্বয়ংক্রিয় স্পিড ক্যামেরা কর্মসূচি প্রত্যাহারের মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সড়কটিতে অতিরিক্ত গতিতে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা ২০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছে স্থানীয় কমিউনিটি সংগঠন “সেফ পার্কসাইড”।

সম্প্রতি প্রকাশিত সিটি অব টরন্টোর বিশ্লেষণভিত্তিক তথ্য তুলে ধরে সংগঠনটি বলেছে, গত নভেম্বরে স্পিড ক্যামেরা অপসারণের পর থেকেই পার্কসাইড ড্রাইভে গতি নিয়ন্ত্রণ কার্যত ভেঙে পড়েছে। এর ফলে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।

সেফ পার্কসাইডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে পার্কসাইড ড্রাইভে ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চলা গাড়ির সংখ্যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ গত বছর একই সময়ে ওই এলাকায় সক্রিয় ছিল স্পিড ক্যামেরা, যা চালকদের ওপর কঠোর নজরদারি চালাত। সংগঠনটির ভাষ্য, স্পিড ক্যামেরা অপসারণের ফলে চালকদের মধ্যে আইন ভাঙার প্রবণতা বেড়েছে এবং তারা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন।

যদিও স্পিড ক্যামেরা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তথাপি সিটির “ওয়াচ ইয়র স্পিড” সাইন এখনো গাড়ির গতি রেকর্ড করে যাচ্ছে। এই ডিভাইসটি সাবেক ক্যামেরা স্থাপনের স্থান থেকে কয়েক মিটার দক্ষিণে বসানো রয়েছে। সিটি অব টরন্টো নিয়মিতভাবে সেই তথ্য প্রকাশ করছে। তবে এখন আর অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য কোনো স্বয়ংক্রিয় জরিমানা বা টিকিট ইস্যু করা হচ্ছে না। ফলে তথ্য থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ না থাকায় চালকদের মধ্যে ভয় বা সতর্কতা কমে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সেফ পার্কসাইডের কো-চেয়ার এবং স্থানীয় বাসিন্দা ফারাজ ঘোলিজাদেহ সিপি২৪-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, স্পিড ক্যামেরা তুলে দিলে যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা আগেই অনুমান করা হয়েছিল। তার ভাষায়, “যখন আপনি সড়ক নিরাপত্তার কার্যকর ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলবেন, তখন গাড়ির গতি বাড়বেই। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হচ্ছে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে।” তিনি আরও বলেন, পার্কসাইড ড্রাইভ দীর্ঘদিন ধরেই টরন্টোর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক হিসেবে পরিচিত। সেখানে স্পিড ক্যামেরা চালুর পর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এলেও সেটি তুলে নেওয়ার পর আবার পুরনো পরিস্থিতি ফিরে এসেছে।

অন্টারিও প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ড এর সরকার গত বছর পুরো প্রদেশজুড়ে স্পিড ক্যামেরা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফোর্ড একে “অর্থ উপার্জনের মাধ্যম” এবং “জনগণের ট্যাক্সের অপচয়” বলে মন্তব্য করেছিলেন। সরকারের যুক্তি ছিল, শুধু জরিমানার ওপর নির্ভর না করে বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সেই হিসেবে স্পিড বাম্প, স্পিড কুশন, উন্নত সাইনেজ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর জোর দেওয়া হয়। তবে সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবে চালকদের আচরণে তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশেষ করে উচ্চগতির চালকদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারির বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।

সেফ পার্কসাইড জানিয়েছে, অপসারণের আগে ওই স্পিড ক্যামেরাটি মোট ৭০ হাজার ২৪৩টি স্পিডিং টিকিট ইস্যু করেছিল। এসব টিকিটের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ লাখ ডলার জরিমানা আদায় করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিসীমা নির্ধারিত এলাকায় এক চালককে ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাতে ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার প্রায় চার গুণ গতিতে চলছিল যানটি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন গতি শুধু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন নয়, বরং পথচারী, সাইকেল আরোহী এবং অন্যান্য চালকদের জীবনের জন্যও মারাত্মক হুমকি।

পার্কসাইড ড্রাইভের পরিস্থিতি এখন অন্টারিওজুড়ে একটি বড় নীতিগত বিতর্কে পরিণত হয়েছে। একদিকে সরকার বলছে, তারা বিকল্প পদ্ধতিতে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়; অন্যদিকে কমিউনিটি সংগঠন ও সড়ক নিরাপত্তা কর্মীরা বলছেন, স্পিড ক্যামেরা অপসারণের ফলে বাস্তব পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সড়কে মানুষের আচরণ পরিবর্তনে শুধু সচেতনতা যথেষ্ট নয়; কার্যকর আইন প্রয়োগও সমান জরুরি। আর সেই জায়গাতেই বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।

টরন্টোর বাসিন্দাদের একাংশ এখন আবারও স্পিড ক্যামেরা ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পার্কসাইড ড্রাইভে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা প্রাণহানির ঘটনা আরও বাড়তে পারে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button