অর্থাভাবের ধাক্কায় আগামী বছর বন্ধ টরন্টোর জলতীর উৎসব

মাসুদ করিম

উৎসবের তালিকা থেকে আপাতত বিদায় নিচ্ছে শহরের অন্যতম জনপ্রিয় জলতীরভিত্তিক আয়োজন

টরন্টোর গ্রীষ্মকালীন উৎসবের তালিকা থেকে আপাতত বিদায় নিচ্ছে শহরের অন্যতম জনপ্রিয় জলতীরভিত্তিক আয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং পরিবারগুলোর কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠা এই উৎসব ২০২৬ সালে আর অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। আয়োজকদের তরফে জানানো হয়েছে, ক্রমবর্ধমান ব্যয়, পৃষ্ঠপোষকতার অনিশ্চয়তা এবং বড় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে ঘিরে কর্পোরেট বাজারের পরিবর্তিত অগ্রাধিকারের কারণে শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠান বাতিলের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

প্রতি বছর টরন্টোর জলতীর এলাকায় অনুষ্ঠিত এই উৎসবকে ঘিরে কয়েকদিন ধরে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো। শিশু থেকে প্রবীণ সব বয়সী মানুষের কাছে এটি ছিল গ্রীষ্মের অন্যতম প্রধান বিনোদন। বিশেষ করে বিশাল আকৃতির ভাসমান হাঁসের প্রদর্শনী উৎসবটির পরিচিতিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলাদা মাত্রা দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রদর্শনীর ছবি ও ভিডিও নিয়মিত ভাইরাল হতো, ফলে দেশ-বিদেশ থেকে দর্শনার্থীদেরও ভিড় বাড়ত।

কিন্তু জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবার আয়োজকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আয়োজক সংস্থার কর্মকর্তারা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের পরিকল্পিত আয়োজনের জন্য তারা নগর প্রশাসন, প্রাদেশিক সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সম্ভাব্য সহায়তার চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রত্যাশিত কোনো আর্থিক সহায়তা মেলেনি। একইসঙ্গে উৎসব আয়োজনের খরচ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। নিরাপত্তা, অবকাঠামো, কর্মী, বিনোদন ব্যবস্থা এবং জলতীর এলাকার ব্যবস্থাপনা সব মিলিয়ে ব্যয়ের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে উঠেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আগামী বছরের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের প্রভাব। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো যৌথভাবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। টরন্টোও সেই আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যুগুলোর একটি। ফলে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং স্পনসরদের বিপুল পরিমাণ বিপণন বাজেট এখন বিশ্বকাপকেন্দ্রিক প্রচারণায় চলে যাচ্ছে। আয়োজকদের দাবি, আগে যেসব প্রতিষ্ঠান উৎসবের বড় অংশের অর্থ জোগান দিত, তারা এবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

উৎসব পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান বাতিলের সিদ্ধান্ত একদিনে নেওয়া হয়নি। বরং আয়োজক দল বিকল্প বাজেট, ছোট পরিসরের আয়োজন কিংবা অংশীদারিত্বের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত তারা মনে করেছেন, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি ছাড়া দর্শকদের প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হবে না। এমন পরিস্থিতিতে নিম্নমানের আয়োজন করার বদলে সাময়িক বিরতি নেওয়াই বেশি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।

এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও হতাশ। কারণ প্রতি বছর উৎসব চলাকালে জলতীর এলাকার রেস্তোরাঁ, দোকান, হোটেল এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা পেত। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গ্রীষ্মকালীন বিক্রির একটি বড় অংশ এই উৎসব ঘিরেই প্রত্যাশা করতেন। ফলে উৎসব বন্ধ থাকায় আগামী বছর তাদের আয়ে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে আয়োজকেরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটি স্থায়ী সমাপ্তি নয়। তারা একে “কৌশলগত বিরতি” হিসেবে দেখছেন। তাদের আশা, আগামী এক বছরে নতুন স্পনসর, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে ২০২৭ সালে নতুন রূপে আবারও উৎসবটি ফিরে আসবে। আয়োজকদের বিশ্বাস, টরন্টোর জলতীর সংস্কৃতির সঙ্গে এই আয়োজন এতটাই গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে যে দর্শকদের ভালোবাসা এবং সমর্থন একে আবারও ফিরিয়ে আনবে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button