ব্যয়ের চাপে হাঁসফাঁস কানাডীয়রা, বাড়ছে আর্থিক ভাঙনের ঘটনা

জুমু চৌধুরী

বিশ্লেষকরা বলছেন, কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর পথে হাঁটলেও সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি তাৎক্ষণিকভাবে ফিরবে না

কানাডার অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও সাধারণ মানুষের জীবনে আর্থিক চাপ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। দেশটির বহু পরিবার এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে মাস শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানোই কঠিন হয়ে উঠেছে। আবাসন ঋণের বাড়তি কিস্তি, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সুদের হার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়ছেন লাখো মানুষ। নতুন অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেনাজনিত আর্থিক সুরক্ষা বা ঋণ পুনর্গঠনের পথে যাওয়ার ঘটনা এখন প্রায় দেড় দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির পরবর্তী সময়ে সুদের হার দ্রুত বাড়তে শুরু করার যে প্রভাব তৈরি হয়েছিল, তার পূর্ণ চাপ এখন গিয়ে পড়ছে সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর। বিশেষ করে যারা কম সুদের সময়ে বড় অঙ্কের আবাসন ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই এখন ঋণ নবায়নের সময় দ্বিগুণ বা তারও বেশি সুদের মুখে পড়ছেন। ফলে মাসিক কিস্তির পরিমাণ কয়েকশ থেকে হাজার ডলার পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।

দেশটির ভোক্তা ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসে দেউলিয়া সুরক্ষা, কনজিউমার প্রোপোজাল বা দেনা পুনর্গঠনের আবেদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে বহু পরিবার তাদের আর্থিক সহ্যসীমার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগছে মধ্যবিত্ত গৃহমালিকদের ওপর। কয়েক বছর আগে কম সুদের সুবিধায় বাড়ি কিনলেও এখন ঋণ নবায়নের সময় তাদের অনেক বেশি সুদ গুনতে হচ্ছে। ফলে আবাসন ঋণের কিস্তি, সম্পত্তি কর, বিদ্যুৎ বিল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, আর্থিক সংকটে পড়া বহু মানুষ সরাসরি দেউলিয়া হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছেন না। বরং তারা “কনজিউমার প্রোপোজাল” বা দেনা পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো কিংবা আংশিক ছাড় পাওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিললেও সামগ্রিক দেনার পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে আবাসন ঋণের বাইরে ব্যক্তিগত ঋণ, ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া এবং দৈনন্দিন খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিসংখ্যান আরও বলছে, যারা ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে পারছেন না, তাদের বকেয়ার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক দ্রুত বাড়ছে। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। যদিও এখনও বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা যায়নি, তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা দেশের ভোক্তা ব্যয় ও আবাসন বাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা দেখা যাচ্ছে কানাডার ব্যয়বহুল আবাসননির্ভর অঞ্চলগুলোতে। বিশেষ করে অন্টারিও ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় আবাসন ঋণের কিস্তি বকেয়া হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই দুই প্রদেশে বাড়ির দাম দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত বেশি। ফলে অনেক পরিবার তাদের আয়ের বড় অংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার আরও দীর্ঘ সময় উচ্চ অবস্থানে থাকলে এসব অঞ্চলে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে।

তবে সংকটের মধ্যেও ভোক্তাদের আচরণে কিছু পরিবর্তনের আভাস মিলছে। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে অনেক পরিবার এখন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর চেষ্টা করছে। বাইরে খাওয়া, ভ্রমণ কিংবা বিলাসী কেনাকাটার প্রবণতা কমেছে। একই সঙ্গে ঋণ কার্ডের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রবণতাও বেড়েছে। বিশেষ করে ছুটির মৌসুম শেষে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বৃদ্ধির হার কিছুটা ধীর হয়েছে বলে সাম্প্রতিক তথ্য থেকে জানা গেছে।

নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে। ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ, ব্যক্তিগত ঋণ কিংবা গাড়ি কেনার অর্থায়ন সব ক্ষেত্রেই গতি কমেছে। যদিও নতুন গাড়ির দাম কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তবু বীমা, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে অনেকের পক্ষেই নতুন গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর পথে হাঁটলেও সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি তাৎক্ষণিকভাবে ফিরবে না। কারণ গত কয়েক বছরে সঞ্চয় কমে গেছে, আর ঋণের বোঝা বেড়েছে বহু গুণ। ফলে সুদের হার কমলেও মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যয় সংকোচনের মধ্য দিয়েই চলতে হতে পারে।

সব মিলিয়ে কানাডার বর্তমান অর্থনৈতিক চিত্রে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার বার্তা থাকলেও অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। খরচ কমিয়ে আর্থিক শৃঙ্খলা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও উচ্চ সুদ ও ঋণের দীর্ঘ ছায়া বহু পরিবারের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নতুন পরিসংখ্যান সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

Related Articles

Back to top button