পরিবেশনীতি নিয়ে ক্ষোভ

দিদার হোসেন

অটোয়ার রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একটি সম্ভাবনা নিয়ে গিলবো কি শেষ পর্যন্ত দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নেবেন?

কানাডার কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নতুন করে অস্বস্তির আবহ তৈরি হয়েছে পরিবেশবাদী রাজনীতিক স্টিভেন গিলবোকে ঘিরে। ক্ষমতাসীন লিবারেল শিবিরের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত গিলবো সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত অবস্থান নিয়ে গভীর অসন্তোষে ভুগছেন বলে একাধিক সরকারি সূত্রের দাবি। আর সেই অসন্তোষ এতটাই তীব্র যে তিনি দলীয় সংসদীয় শিবিরে নিজের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও নতুন করে ভাবছেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, তেল পরিবহন ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত প্রতিশ্রুতিতে শিথিলতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সরকারের সঙ্গে গিলবোর দূরত্ব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তকে তিনি শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে দেখছেন না; বরং সেগুলোকে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবেও বিবেচনা করছেন।

অটোয়ার রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে একটি সম্ভাবনা নিয়ে গিলবো কি শেষ পর্যন্ত দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র অবস্থান নেবেন? সূত্রগুলোর দাবি, তিনি এমন একটি পথ বিবেচনা করছেন যেখানে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখলেও দলীয় অবস্থানের সঙ্গে নিজেকে আর সম্পূর্ণভাবে যুক্ত রাখবেন না। এমনকি ভবিষ্যতের নির্বাচনী রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টিও তার ভাবনায় রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

যদিও এ নিয়ে গিলবোর পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি, তবে তার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য পরিস্থিতির গভীরতাই তুলে ধরছে। তাদের মতে, তিনি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি এবং পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু সরকারের বর্তমান পরিবেশনীতি তাকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে এমন ইঙ্গিত স্পষ্টভাবেই পাওয়া যাচ্ছে।

ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে পরিবেশ ইস্যু নিয়ে যে নীরব মতবিরোধ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, গিলবোকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি সেটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে। গত কয়েক মাস ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্প, দূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবেশগত মানদণ্ড এবং শিল্প খাতের ওপর পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিল করার প্রশ্নে দলটির ভেতরে একাধিক সংসদ সদস্য অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তাদের অধিকাংশই প্রকাশ্যে অবস্থান না নিলেও গিলবোর ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে তার রাজনৈতিক অতীতের কারণেই।

রাজনীতিতে প্রবেশের বহু আগে থেকেই গিলবো কানাডার পরিবেশ আন্দোলনের পরিচিত মুখ। জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় তিনি আন্দোলন ও নাগরিক প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে পরিবেশ প্রশ্নে আপসকামী অবস্থান তার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন তার ঘনিষ্ঠরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এর আগেও একটি বড় জ্বালানি সমঝোতার প্রতিবাদে গিলবো মন্ত্রিসভা ছেড়েছিলেন। সেই সময় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবেশকে উপেক্ষা করে নেওয়া সিদ্ধান্ত তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো অবস্থানের প্রতিফলন আবারও দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

অন্যদিকে সরকারের ভেতর থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যাও উঠে আসছে। মন্ত্রীপরিষদের কয়েকজন সদস্যের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের যুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই পরিবেশগত আদর্শ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে সমালোচকদের মতে, এই “ভারসাম্যের” যুক্তিই ধীরে ধীরে কানাডার পরিবেশগত প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জলবায়ু অঙ্গনে কানাডা যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু জ্বালানি সিদ্ধান্তের সাংঘর্ষিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবাদীরা।

গিলবো শেষ পর্যন্ত দল ছাড়বেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কানাডার রাজনীতিতে “পরিবেশ বনাম জ্বালানি” বিতর্ক নতুন করে তীব্র হতে যাচ্ছে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন দীর্ঘদিনের পরিবেশকর্মী থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠা স্টিভেন গিলবো।

Related Articles

Back to top button