আদালতে কড়া জেরা, প্রতিবেশী হত্যার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার অভিযুক্তের

জামির হোসেন

লিবার্টি ভিলেজে আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজ হাবিব হত্যাকাণ্ডের বিচারপর্বে নতুন করে উঠে এসেছে প্রতিবেশী সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহজনক গতিবিধি এবং ঘটনার পর প্রমাণ গোপনের সম্ভাব্য চেষ্টার নানা প্রশ্ন

কানাডার টরন্টোর লিবার্টি ভিলেজে আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজ হাবিব হত্যাকাণ্ডের বিচারপর্বে নতুন করে উঠে এসেছে প্রতিবেশী সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহজনক গতিবিধি এবং ঘটনার পর প্রমাণ গোপনের সম্ভাব্য চেষ্টার নানা প্রশ্ন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের জেরার মুখে অভিযুক্ত খোয়া ট্রানকে একের পর এক কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হলেও তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২৩ সালের জুন মাসে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্র নির্মাতা রিয়াজ হাবিব। তিনি টরন্টোর লিবার্টি ভিলেজ এলাকার একটি আবাসিক ভবনে বসবাস করতেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার রাতে গভীর রাতে তার বাসা থেকে চিৎকার ও অস্বাভাবিক শব্দ শোনার কথা জানান কয়েকজন বাসিন্দা। তবে ঘটনার পরপরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়নি। দুই দিন পর ভবনের নিচের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অংশ থেকে উদ্ধার করা হয় হাবিবের মরদেহ। এরপরই শুরু হয় ব্যাপক তদন্ত, যার সূত্র ধরে দ্বিতীয় স্তরের হত্যার অভিযোগ আনা হয় তার নিচতলার প্রতিবেশী খোয়া ট্রানের বিরুদ্ধে।

সাম্প্রতিক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ বিশেষভাবে নজর দেয় অভিযুক্তের আচরণ ও বক্তব্যের অসঙ্গতির দিকে। প্রসিকিউটর আদালতে প্রশ্ন তোলেন, যদি ট্রান সত্যিই ওই রাতে চিৎকার, ধস্তাধস্তি বা সিঁড়িতে পড়ে যাওয়ার মতো শব্দ শুনে থাকেন, তাহলে তিনি প্রথমেই কেন পুলিশকে বিস্তারিত কিছু জানাননি। জবাবে ট্রান বলেন, তিনি তখন পরিস্থিতিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ভাবেননি। তার দাবি, তিনি ধারণা করেছিলেন হয়তো কোনো মানসিক সংকট, পারিবারিক সমস্যা কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছিল।

আদালতে নিহতের বাসার চাবি নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, অভিযুক্তের কাছে একসময় হাবিবের অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশের সুযোগ ছিল এবং সেটি তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও ট্রান আদালতে বলেন, সেটি ছিল একবারের জন্য দেওয়া অস্থায়ী অনুমতি। তিনি দাবি করেন, পরবর্তীতে চাবি ফেরত দেওয়া হয়েছিল এবং তার আর নিয়মিত প্রবেশাধিকার ছিল না।

শুনানিতে এক প্রতিবেশীর সাক্ষ্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। ওই সাক্ষী আদালতে জানান, ঘটনার পরদিন তিনি অভিযুক্তের মতো দেখতে একজনকে নিহতের বাসা থেকে বের হতে দেখেছেন। তবে ট্রান এই বক্তব্য সরাসরি অস্বীকার করেন। যদিও তিনি স্বীকার করেন, ভবনের নির্দিষ্ট কিছু ইউনিটে প্রবেশাধিকার সীমিত সংখ্যক বাসিন্দার মধ্যেই ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষ এরপর ভবনের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রবেশ নথি সামনে আনে। অভিযোগ করা হয়, ঘটনার পর নিহতের পরিচয় ব্যবহার করে ভবনের নিচের অংশে যাতায়াত করা হয়েছিল। ট্রান দাবি করেন, সেই ব্যক্তি তিনি নন। তবে জেরার এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন যে নিহতের সাইকেল ফেলে দেওয়ার ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন। আদালতে তিনি বলেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে আগের বিরোধের কারণে রাগের মাথায় তিনি এমন কাজ করেছিলেন। পরে তিনি সেই আচরণের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন।

মামলার শুনানিতে আরও উঠে আসে, মৃত্যুর কয়েক দিন আগে রিয়াজ হাবিব ও খোয়া ট্রানের মধ্যে ধোঁয়া নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ধূমপানের ধোঁয়া নিয়ে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং পরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে বসলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ট্রানের দাবি, ওই বৈঠকে তাকে অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়েছিল। তবে তিনি আদালতে বলেন, পরবর্তীতে তিনি বিষয়টি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং নতুন করে কোনো বিরোধ চাননি।

জেরার শেষদিকে রাষ্ট্রপক্ষ সরাসরি অভিযোগ তোলে যে ট্রানই রিয়াজ হাবিবকে হত্যা করেছেন এবং পরে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত আদালতে দৃঢ়ভাবে সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষ্য, ঘটনার রাতে তিনি নিজের বাসা থেকেই বের হননি।

এই মামলায় আগের শুনানিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য সামনে আসে। এক ব্যক্তি, যিনি ঘটনার সময় অভিযুক্ত দম্পতির বাসায় থাকতেন, আদালতে দাবি করেন তাকে পুলিশকে কিছু না বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, পুরো পরিস্থিতি তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, কিন্তু আর্থিক ও ব্যক্তিগত নির্ভরশীলতার কারণে তিনি তখন নীরব ছিলেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই মামলায় খোয়া ট্রানের স্ত্রীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও অভিযুক্ত দুজনই নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছেন। আদালতে এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা চলছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নজরদারি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রবেশ নথি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

টরন্টোর এই বহুল আলোচিত মামলাটি এখন কানাডার গণমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ, এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়; বরং নগর জীবনে প্রতিবেশী সম্পর্ক, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব এবং মানসিক চাপ কীভাবে ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

Related Articles

Back to top button