
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে অস্বাভাবিক যানচাপ ও চলাচল সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনেই প্রভাব ফেলবে না, বরং সরকারি প্রশাসনের কর্মপদ্ধতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। বিশেষ করে প্রাদেশিক সরকারি কর্মীদের অফিসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক রাখার বর্তমান নীতির বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বিভিন্ন মহলে।
অন্টারিও প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকার নীতি আপাতত বহাল থাকলেও বিশ্বকাপ চলাকালে বিশেষ পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে নমনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, দিনের বেলায় অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলোর সময় টরন্টোর কেন্দ্রীয় এলাকায় যাতায়াত পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বিভাগীয় কর্মকর্তাদের হাতে স্বল্প সময়ের জন্য বাসা থেকে কাজের অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে টরন্টোতে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় চলমান অবকাঠামো উন্নয়নকাজ, সড়ক সংস্কার এবং পরিবহনব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, খেলার দিনগুলোতে যানবাহনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে এবং অফিস সময়ে গণপরিবহনেও অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় সরকারি কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি সংগঠন সম্প্রতি প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যৌথভাবে আবেদন জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিশ্বকাপ চলাকালে বিশেষ করে টরন্টোভিত্তিক সরকারি কর্মীদের জন্য বিকল্প কর্মব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। সংগঠনগুলোর মতে, দীর্ঘ যানজট, অতিরিক্ত যাতায়াত সময় এবং নিরাপত্তাজনিত চাপ কর্মীদের উৎপাদনশীলতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কর্মী প্রতিনিধিদের বক্তব্য, করোনা মহামারির সময় দূরবর্তী কর্মপদ্ধতি সফলভাবে পরিচালিত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্তত সাময়িকভাবে নমনীয় কর্মপরিবেশ তৈরি করা হলে প্রশাসনিক কার্যক্রমও সচল থাকবে এবং কর্মীদের দুর্ভোগও কমবে। তারা আরও বলছেন, বিশ্বকাপের মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে পুরোনো কাঠামো ধরে রাখার পরিবর্তে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অন্যদিকে টরন্টো নগর প্রশাসনও আগেভাগেই বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সতর্কবার্তা দিয়েছে। নগর কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, বিশ্বকাপ চলাকালে অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমাতে কর্মঘণ্টা পরিবর্তন, হাইব্রিড কর্মব্যবস্থা কিংবা বাসা থেকে কাজের সুযোগ বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাদের মতে, শহরের স্বাভাবিক পরিবহনব্যবস্থা বজায় রাখতে সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন হবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত বছর অন্টারিও সরকার সরকারি কর্মীদের পূর্ণ সময় অফিসে ফিরিয়ে আনার নীতি কার্যকর করে। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। অনেকের অভিযোগ ছিল, কর্মীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
নীতিটি চালুর পর বহু কর্মী বিশেষ ছাড় বা বিকল্প কর্মব্যবস্থার জন্য আবেদন করলেও অনুমোদনের হার খুবই সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রশাসন এখনো আগের কঠোর অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি। তবে বিশ্বকাপকে ঘিরে সৃষ্ট সম্ভাব্য সংকট পরিস্থিতি সরকারের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা আনতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়; এটি একটি বিশাল নগর ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জও। এমন পরিস্থিতিতে কর্মপরিবেশ নিয়ে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষও আরও বাড়তে পারে।
এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসবে, অন্টারিও সরকার তাদের বর্তমান নীতিতে কতটা পরিবর্তন আনে এবং নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার



