ভাঙার আগে রঙিন বিদায়: টরন্টোর বাড়িতে শিল্পীদের অনন্য ম্যুরাল প্রকল্প

আনাস মোহাম্মদ

শেষ পর্যন্ত ৯১ বার্টন স্ট্রিটের সেই পুরোনো বাড়িটি কেবল একটি আবাসন নয়, বরং হয়ে উঠেছে এক সাময়িক শিল্প-ঐতিহ্য

টরন্টোর প্রাণকেন্দ্রে, ব্লুর ও বাথারস্ট স্ট্রিটের সংযোগস্থলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ৯১ বার্টন স্ট্রিটের পুরোনো বাড়িটি হয়তো অচিরেই হারিয়ে যাবে সময়ের প্রবাহে। কিন্তু তার আগে সে রেখে গেল এক অমলিন স্মৃতি রঙ, শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এই পুরোনো বাড়িটিকে ভাঙার আগে সেটিকে রঙে রঙিন করে তোলা হয়েছে নানা শিল্পীর হাতে। বাড়িটির ভেতর-বাহিরজুড়ে আঁকা হয়েছে ম্যুরাল বিভিন্ন রঙ, শৈলী ও গল্পে ভরপুর চিত্রকর্ম। স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী এমনকি শিল্পানুরাগীদের কাছেও এটি এখন এক ব্যতিক্রমী আকর্ষণ।

“আর্ট অন বার্টন” নামে এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়েছেন টরন্টোভিত্তিক মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি শিল্পী স্টেফানি অ্যাভারি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি বড় আকারের সম্মিলিত ম্যুরাল প্রকল্পের স্বপ্ন দেখছিলেন। অবশেষে যখন জানতে পারেন যে বার্টন স্ট্রিটের পুরোনো এই বাড়িটি শিগগিরই ভেঙে ফেলা হবে, তখনই তিনি সেটিকে শিল্পকর্মের ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।

অ্যাভারি বলেন, “এটা শুধুই দেয়ালে রঙ নয় এটা ছিল এক পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা। এখানে ইতিহাস, বিদায় এবং নতুন সূচনার গল্প একসাথে বোনা হয়েছে। প্রতিটি তুলির আঁচড়ে লুকিয়ে আছে আবেগ, সময়ের চিহ্ন, এবং ভবিষ্যতের আশাবাদ।”

গত মাস জুড়ে প্রায় ৪০ জন উদীয়মান ও অভিজ্ঞ শিল্পী একসাথে কাজ করেন এই প্রকল্পে। কেউ আঁকেন বিমূর্ত ভাবনার ছবি, কেউ সামাজিক বার্তা, কেউ বা ঐতিহাসিক প্রতিচ্ছবি। বাড়ির প্রতিটি দেয়াল, সিঁড়ি, এমনকি দরজার কাঠেও রঙের ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে জীবন ও শিল্পের মেলবন্ধন। এই কাজের ফলে পুরোনো ভবনটি যেন এক জীবন্ত গ্যালারিতে রূপ নেয় যেখানে প্রতিটি কোণায় রয়েছে নতুন গল্প, নতুন অনুভব।

বাড়িটির মালিক প্রতিষ্ঠান গ্রিনস্ট্রিট ফ্ল্যাটস পুরোপুরি সমর্থন দিয়েছে এই প্রকল্পে। সাধারণত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো ভবন ভাঙার আগে এমন শিল্পচর্চার সুযোগ দেয় না। কিন্তু গ্রিনস্ট্রিট ফ্ল্যাটসের প্রেসিডেন্ট লিওনিড কোটোভ এই উদ্যোগকে দেখেছেন সমাজের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলার এক অসাধারণ উপায় হিসেবে।

কোটোভ বলেন, “এটা শুধু একটি বাড়িকে সাজানো নয়; এটা কমিউনিটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি প্রচেষ্টা। আমরা বিশ্বাস করি, নতুন ভবন গড়ে তোলার পাশাপাশি পুরোনোটির স্মৃতিও সংরক্ষণ করা উচিত এবং শিল্প তার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।”

প্রতিষ্ঠানটি আগেও তাদের আবাসন প্রকল্পে ম্যুরাল অন্তর্ভুক্ত করেছিল, তবে ভাঙার অপেক্ষায় থাকা ভবনে এই প্রথম তারা এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হলো।

অ্যাভারি প্রথমে গত ৩০ মে গ্রিনস্ট্রিট ফ্ল্যাটসের সঙ্গে প্রকল্পের প্রস্তাবনা ভাগ করেন। প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং এরপর শুরু হয় লজিস্টিকস, সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় অনুমতির বিস্তারিত পরিকল্পনা। শিল্পীদের হাতে বাড়ির চাবি তুলে দেওয়া হয় যেন তারা নিজেদের মতো করে সৃজনশীলভাবে কাজ করতে পারেন।

প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা দায়িত্বে ছিলেন ববি বেকেট, যিনি অ্যাভারির সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেন শিল্পীদের উপকরণ, সময় ও সৃজনশীল স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে।

শেষ পর্যন্ত ৯১ বার্টন স্ট্রিটের সেই পুরোনো বাড়িটি কেবল একটি আবাসন নয়, বরং হয়ে উঠেছে এক সাময়িক শিল্প-ঐতিহ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, “আর্ট অন বার্টন” শুধু দেয়ালে রঙ নয়, বরং শহরের সংস্কৃতির মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।

এক পথচারীর ভাষায়, “আমরা প্রতিদিন এখানে হাঁটি, কিন্তু কখনও ভাবিনি ভাঙার অপেক্ষায় থাকা একটি বাড়িও এত জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে। এটা যেন বিদায়ের আগে শেষ উৎসব।”

“আর্ট অন বার্টন” প্রমাণ করল একটি ভবনের অস্তিত্ব শেষ হওয়ার আগেও সে নতুনভাবে জন্ম নিতে পারে মানুষের হৃদয়ে, শিল্পের ছোঁয়ায়। ভাঙা দেয়ালের ফাঁক গলে উঁকি দেয় সৃষ্টিশীলতার আলো, যা মনে করিয়ে দেয় শেষ মানেই শেষ নয়; কখনও কখনও শেষই হয় নতুন সূচনার রঙিন শুরু।

Related Articles

Back to top button