ফার্স্ট নেশনের জন্য ভ্রমণ পরামর্শ নিয়ে হতাশ জে ট্রিটি বর্ডার অ্যালায়েন্স

মাসুদ করিম

জে ট্রিটি বর্ডার অ্যালায়েন্স-এর কো-চেয়ার এবং চিফস অব অন্টারিওর রিজিওনাল চিফ আব্রাম বেনেডিক্ট সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে – পাসপোর্টের ওপর এই বাড়তি গুরুত্ব প্রদান আদিবাসীদের ঐতিহাসিক পরিচয়কে খাটো করে

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কয়েক শতাব্দীর পুরনো সীমান্ত নীতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি কানাডা সরকারের পক্ষ থেকে জারি করা একটি ‘ভ্রমণ নির্দেশিকা’ কেন্দ্র করে আদিবাসী ফার্স্ট নেশন জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই নির্দেশনাকে আদিবাসী অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠনগুলো কেবল “হতাশাজনক” নয়, বরং “দায়িত্বজ্ঞানহীন” বলে অভিহিত করেছে।

গত সপ্তাহে কানাডা সরকার যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ সংক্রান্ত নিয়মাবলী হালনাগাদ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সীমান্ত অতিক্রমের সময় ফার্স্ট নেশন সদস্যরা যেন তাদের প্রথাগত ‘সিকিউরিটি স্ট্যাটাস কার্ড’-এর পাশাপাশি একটি বৈধ কানাডিয়ান পাসপোর্ট সাথে রাখেন। সরকারের দাবি, এই পদক্ষেপের ফলে সীমান্তে দীর্ঘসূত্রতা কমবে এবং প্রবেশ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও দ্রুততর হবে।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ১৭৯৪ সালে স্বাক্ষরিত ‘জে ট্রিটি’। তৎকালীন গ্রেট ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তির আওতায় কানাডায় জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান ইন্ডিয়ানরা যুক্তরাষ্ট্রে অবাধে যাতায়াত, বসবাস, শিক্ষা গ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের আইনি অধিকার লাভ করেন। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই সীমান্ত পারাপার কোনো সাধারণ পর্যটন নয়, বরং এটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যগত এবং সার্বভৌম অধিকার।

জে ট্রিটি বর্ডার অ্যালায়েন্স-এর কো-চেয়ার এবং চিফস অব অন্টারিওর রিজিওনাল চিফ আব্রাম বেনেডিক্ট সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে – পাসপোর্টের ওপর এই বাড়তি গুরুত্ব প্রদান আদিবাসীদের ঐতিহাসিক পরিচয়কে খাটো করে। এটি প্রকারান্তরে তাদের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করার নামান্তর। সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার সংশ্লিষ্ট আদিবাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করেনি।

আদিবাসী নেতাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বৈধ পাসপোর্ট থাকার পরেও সাধারণ কানাডিয়ান নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। কিন্তু জে ট্রিটির সুরক্ষার কারণে ফার্স্ট নেশন সদস্যদের ক্ষেত্রে এই প্রত্যাখ্যানের সুযোগ নেই। ফলে পাসপোর্টের ওপর জোর দেওয়া আসলে তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অধিকারের চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

ফার্স্ট নেশন জনগোষ্ঠীর জন্য এই সীমান্ত কেবল একটি রাজনৈতিক রেখা নয়। তাদের সংস্কৃতি, উৎসব এবং আত্মীয়তার বন্ধন দুই দেশের সীমানা জুড়ে বিস্তৃত। নিয়মিতভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পারিবারিক কারণে তাদের এই সীমান্ত পার হতে হয়। নতুন এই প্রশাসনিক জটিলতা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি কানাডা সরকারের জন্য একটি জটিল রাজনৈতিক ও আইনি পরীক্ষা। একদিকে আধুনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশাসনিক প্রয়োজন, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও আবেগ বিবেচনা না করে এই নির্দেশনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে এই অসন্তোষ আইনি লড়াই পর্যন্ত গড়াতে পারে। ট্রুডো সরকারের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো আদিবাসীদের সাথে ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনর্মিলনের যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল, তার মর্যাদা রক্ষা করা।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button