হাসপাতালে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তে উদ্বেগ, স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বাড়ছে চাপ

মাসুদ করিম

অন্টারিওর হাসপাতালগুলোর আর্থিক সংকট শুধুমাত্র ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়

অন্টারিও প্রদেশের স্বাস্থ্যখাতে নতুন করে উদ্বেগের সঞ্চার হয়েছে, কারণ ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মীসংখ্যা কমানোর উদ্যোগ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী অটোয়ার একটি বড় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে সামনের সারির কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, এই পদক্ষেপ সরাসরি রোগীসেবার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।

অটোয়ার ব্রুইয়ের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি প্রায় ৫৫টি পদ কমানোর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত কয়েক বছরে ক্রমাগত বাড়তে থাকা আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে এবং অন্যান্য সমমানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীসংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় ঘাটতি প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, যে পদগুলো বাতিল করা হচ্ছে তার বড় একটি অংশই রোগীদের সরাসরি সেবা প্রদানকারী কর্মীদের। ফলে কর্মীসংখ্যা কমে গেলে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চাপ আরও বাড়বে এবং রোগীদের সঙ্গে তাদের সময় কমে যাবে। এতে চিকিৎসার মান ও রোগীদের নিরাপত্তা দুটিই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সংগঠনের এক নেতা জানান, বর্তমানে অনেক কর্মীই স্বাভাবিক কাজের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যাহ্ন বিরতি বা প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ছাড়াই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কর্মী ছাঁটাই হলে তা শুধু কর্মীদের জন্য নয়, রোগীদের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্টারিওর হাসপাতালগুলোর আর্থিক সংকট শুধুমাত্র ব্যয় কমানোর মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ার কারণে হাসপাতাল ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে খরচ কমানোর পাশাপাশি কাঠামোগত পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে।

বর্তমানে অন্টারিওর হাসপাতাল খাতে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, যা দিন দিন বাড়ছে। হাসপাতালগুলো বিভিন্ন উপায়ে খরচ কমানোর চেষ্টা করলেও এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। অন্যদিকে, প্রাদেশিক সরকার আগামী তিন বছরের মধ্যে হাসপাতালগুলোর বাজেট ভারসাম্যে আনার লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তবে বাস্তবতা হলো স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় প্রতি বছরই বাড়ছে, যা এই লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলছে। এদিকে প্রদেশের অনেক হাসপাতালে জরুরি বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা, করিডরে রোগী রাখার মতো সমস্যাও ক্রমশ বাড়ছে। এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হলেও স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কমেনি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন। এর মধ্যে ঘরে বসে চিকিৎসা সেবা (হোম কেয়ার) সম্প্রসারণ, প্রযুক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার এবং হাসপাতালগুলোর সেবার ধরন পুনর্নির্ধারণের মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সার্বিকভাবে, অন্টারিওর স্বাস্থ্যখাতে বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তা যেখানে ব্যয় সংকোচনের সঙ্গে সঙ্গে সেবার মান বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে এবং রোগীসেবাকে নিরাপদ ও কার্যকর রাখতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

মাসুদ করিম : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

Related Articles

Back to top button