
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের কানাডার সাধারণ কর্মজীবী মানুষের ওপরও পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে গ্যাস ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাইড-শেয়ার চালক ও ট্রাকচালকেরা। তারা বলছেন, জ্বালানির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবিকা নির্বাহকে দিন দিন কঠিন করে তুলছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে কানাডার পাম্পগুলোতে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারেতে বসবাসকারী রাইড-শেয়ার চালক প্রদীপ মেহতা এই পরিস্থিতির অন্যতম ভুক্তভোগী। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি লিটার গ্যাসের দাম প্রায় ১ দশমিক ৭ ডলারে পৌঁছেছে, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি। তার মতে, প্রায় ছয় বছর আগে প্রতি লিটার গ্যাসের দাম ছিল প্রায় ১ দশমিক ১ ডলার। এই সময়ে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। মেহতা বলেন, “গত সপ্তাহেই হঠাৎ করে গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে গেছে। গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তিনি আরও জানান, ব্যক্তিগত জীবনেও এই পরিস্থিতি তাকে চাপে ফেলেছে। তার বৃদ্ধ বাবাকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হয়, আর সেই কারণেই তিনি রাইড-শেয়ার চালকের মতো নমনীয় সময়ের কাজ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাজটিও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। মেহতার ভাষায়, “এই পেশায় স্বাধীনতা আছে ঠিকই, কিন্তু খরচ এত বেড়ে গেছে যে বর্তমানে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
কানাডায় গিগ ইকোনমির ওপর নির্ভরশীল হাজারো কর্মীর মতো মেহতাও এখন অতিরিক্ত সময় কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি জানান, ন্যূনতম জীবিকা বজায় রাখতে তাকে প্রতি সপ্তাহে ৭০ ঘণ্টারও বেশি সময় গাড়ি চালাতে হচ্ছে। গ্যাসবাডি ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় বর্তমানে নিয়মিত গ্যাসের গড় মূল্য প্রতি লিটার প্রায় ১ দশমিক ৭২ ডলার। তবে দেশের সব অঞ্চলে পরিস্থিতি কিন্তু এক নয়। উদাহরণস্বরূপ, অন্টারিও প্রদেশে একই ধরনের গ্যাসের দাম এখনো প্রতি লিটার দেড় ডলারের নিচে রয়েছে।
তবে শুধু গ্যাসের দামই নয়, রাইড-শেয়ার চালকদের ওপর আরও নানা খরচের চাপ রয়েছে। মেহতা জানান, রাইড-শেয়ার প্ল্যাটফর্মের কমিশন, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিমা খরচ মিলিয়ে তার আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয়ে যায়। তার ওপর নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, “যত আয় করি, তার একটা বড় অংশ খরচ হয়ে যায়। এখন গ্যাসের দাম বাড়ায় হাতে প্রায় কিছুই থাকে না।”
শুধু রাইড-শেয়ার চালক নয়, ট্রাকচালকরাও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রিচমন্ডের বাসিন্দা আলি এয়মাই গত ১৫ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন। তিনি জানান, সম্প্রতি ডিজেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এয়মাই বলেন, “প্রতি লিটার ডিজেলের দাম এখন প্রায় ২ দশমিক ২৬ ডলারে পৌঁছেছে। এটি আমাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।” তার মতে, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও। কারণ পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামও বাড়তে বাধ্য। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “ডিজেলের দাম বাড়লে সবকিছুর দামই বাড়বে। এতে করে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো।”
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে জ্বালানির দামে। কানাডার মতো দেশ, যেখানে পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবনে গাড়ির ব্যবহার অত্যন্ত বেশি, সেখানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়; এর অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে। কানাডার রাইড-শেয়ার চালক ও ট্রাকচালকদের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
Masud Karim : Local Journalism Initiative Reporter



