ওসাপ অনুদান কমানোর সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীরা হতাশ

মাসুদ করিম

অন্টারিও শিক্ষামন্ত্রী পল ক্লান্দ্রা

অন্টারিওতে উচ্চশিক্ষা খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা ঘিরে তীব্র উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে পোস্ট-সেকেন্ডারি শিক্ষার্থীদের মধ্যে। দীর্ঘ সাত বছরের টিউশন ফি বৃদ্ধির স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া এবং অন্টারিও স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (ওসাপ)-এর অনুদান কাঠামোয় বড়সড় কাটছাঁটের সিদ্ধান্তকে শিক্ষার্থীরা তাদের ভবিষ্যতের জন্য ‘অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন।

গত সপ্তাহে প্রাদেশিক সরকার জানায়, ওসাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়, সেখানে অনুদানের অংশ মোট তহবিলের ৮৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অর্থাৎ, আগে যেখানে সহায়তার বড় অংশই অনুদান হিসেবে দেওয়া হতো, এখন তার অধিকাংশই ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। ফলে শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষার্থীদের কাঁধে ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

একইসঙ্গে সরকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আগামী তিন বছরে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত টিউশন ফি বৃদ্ধির অনুমতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে টানা সাত বছর ধরে বহাল থাকা টিউশন ফি বৃদ্ধির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হলো। সরকার বলছে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের মতে, এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

ওসাপের কাঠামোয় এই পরিবর্তন খাদ্য, আবাসন ও টিউশন ফি পরিশোধে যেসব শিক্ষার্থী অনুদানের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি হবে ‘বিপর্যয়কর’। মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির দিবতীয় বর্ষের  শিক্ষার্থী দিমা ফারহানা জানান, তার মতো অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে অনুদান কমে গেলে তাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

তিনি আরও বলেন, “এই নীতিগত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের কাছে এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে, আমাদের আর্থিক বাস্তবতা কিংবা মানসিক চাপের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে নেই।” তার মতে, শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়; বরং এটি একটি মৌলিক অধিকার, যা আর্থিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়।

অন্যদিকে, বাংলাদেশি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অব টরন্টো ইউনির্ভাসিটির একজন সংগঠক মৌলি হাসান বলেন, বর্তমানে শিক্ষার্থীরা মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা সংকটের চাপে আছেন। বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় ইতোমধ্যে অনেক বেশি। এর মধ্যে টিউশন ফি বৃদ্ধি ও অনুদান হ্রাস উচ্চশিক্ষাকে আরও কম প্রাপ্তিযোগ্য করে তুলবে। মৌলি আরো বলেন,  এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পড়াশোনার সময়ই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গ্র্যাজুয়েশনের পরও দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের আর্থিক জীবনে প্রভাব ফেলবে। “আমাদের অনেকেই কর্মজীবন শুরু করবেন বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে। এতে বাড়ি কেনা, সঞ্চয় গড়া বা পরিবার পরিকল্পনার মতো সিদ্ধান্তগুলোও বিলম্বিত হতে পারে,” মন্তব্য করেন তিনি।

প্রাদেশিক সরকারের এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে আর্থিক চাপ ও বাজেট পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ হলো, সরকার যদি উচ্চশিক্ষা খাতে সরাসরি অনুদান কমায় এবং সেই ঘাটতি পূরণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিউশন বাড়ানোর সুযোগ দেয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার বোঝা পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপরই।

অনুদান থেকে ঋণভিত্তিক সহায়তায় ঝোঁক বাড়লে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কারণ, ঋণ গ্রহণের মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের অনিশ্চয়তা অনেককে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এদিকে শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভারসাম্য নয়, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সব মিলিয়ে, অন্টারিওর উচ্চশিক্ষা খাতে ঘোষিত এই পরিবর্তন একদিকে সরকারের বাজেট নীতির প্রতিফলন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বাড়তে থাকা সমালোচনার মুখে সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকে, নাকি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আমলে নিয়ে কোনো সমন্বিত সমাধানের পথে এগোয়।

Masud Karim : Local Journalism Initiative Reporter

Related Articles

Back to top button