কানাডা থেকে বহিস্কারের মুখে হাজারো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, বিক্ষোভে উত্তাল বিভিন্ন প্রদেশ

মুসা বিশ্বাস

ফেডারেল সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এখন বহিস্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন

কানাডার নতুন অভিবাসন নীতির হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন দেশটির আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা। ফেডারেল সরকারের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায় ৭০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এখন বহিস্কারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। যারা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে কানাডায় পা রেখেছিলেন, তাদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত ও অচলাবস্থায় পৌঁছে গেছে।

স্টুডেন্ট অ্যাডভোকেসি গ্রুপ নওজোয়ান সাপোর্ট নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, এ বছরের শেষের দিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ওয়ার্ক পারমিট মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। নতুন নীতির ফলে এই শিক্ষার্থীরা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করলেও দেশে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। সরকারের নতুন নীতি অনুযায়ী স্টাডি পারমিট সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষা শেষে স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার স্বপ্ন ধ্বংস হওয়ার পথে। তারা শুধু হাতে পাবেন কোটি কোটি ডলারের সমপরিমাণ শিক্ষা ঋণের বোঝা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। দেশজুড়ে বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নেমেছেন। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ডে আইনসভার বাইরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা গত তিন মাস ধরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান ধর্মঘট চালাচ্ছেন।

তাদের অভিযোগ, প্রাদেশিক মনোনয়ন কর্মসূচি (PNP) অনুযায়ী স্থায়ী বাসিন্দার সুযোগ ২৫ শতাংশ হ্রাস করার ফলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। অন্টারিও, ম্যানিটোবা এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। ফলে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

সাবেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মেহাকদীপ সিং এনআরবি টিভিকে বলেন, “ঝুঁকি নিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি বছর আমি কানাডায় কাটিয়েছি। পড়াশোনা করেছি, কাজ করেছি, কর দিয়েছি, CRS পয়েন্ট সংগ্রহ করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরকার শুধু আমার পরিশ্রমের সুযোগই নিয়েছে, কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।” তিনি জানান, তার পরিবার সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে টিউশন ফি পরিশোধ করেছেন। এখন তার ওয়ার্ক পারমিট শেষ হওয়ার পথে, অথচ স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেডারেল ও প্রাদেশিক নীতির মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। অভিবাসন পরামর্শক কানওয়ার সিয়েরাহ মন্তব্য করেছেন, “কোনো ধারাবাহিকতা নেই। সরকার শিক্ষার্থীদের সুবিধা নিচ্ছে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎকে সংকটে ঠেলে দিচ্ছে।”

শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো আরও জানাচ্ছে, কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করছে। প্রতি বছর শিক্ষার্থীরা টিউশন ফি বাবদ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছেন। কিন্তু নীতি পরিবর্তনের কারণে তাদের অর্জন প্রায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন, যদি দ্রুত এই সংকট সমাধান না করা হয়, তবে শুধু আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরাই নয়, কানাডার উচ্চশিক্ষা খাত ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর স্রোত কমলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক সংকটে পড়বে এবং দেশের শ্রমবাজারও দক্ষ তরুণ কর্মী হারাবে।

এখন দৃষ্টি সবার সরকারের দিকে কীভাবে তারা এই নীতিগত পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব সামাল দেবেন এবং হাজারো শিক্ষার্থীর ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেবেন।

Related Articles

Back to top button