
উত্তর-পশ্চিম অন্টারিও জুড়ে ভয়াবহ দাবানলের তাণ্ডবে নজিরবিহীন মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, প্রবল বাতাসের কারণে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় বহু এলাকাকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। প্রদেশজুড়ে বর্তমানে শতাধিক দাবানল জ্বলছে, যার মধ্যে অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে কলিন্স ফার্স্ট নেশন (নামাইগুসিসাগাগুন) নামে একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী সম্প্রদায়। সম্প্রদায়ের প্রধান (চিফ) হেলেন পাওভোলা নিশ্চিত করেছেন, মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে গোটা জনপদ আগুনে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
চিফ হেলেন পাওভোলার ভাষায়, “আমরা বেঁচে ফিরেছি, কিন্তু এখন আমাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। পুরো সম্প্রদায় এক ঘণ্টারও কম সময়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।” দাবানল যখন গ্রামটিকে গ্রাস করে, তখন তিনি অটোয়ায় অনুষ্ঠিত অ্যাসেম্বলি অব ফার্স্ট নেশনস (AFN)-এর বার্ষিক অধিবেশনে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে তিনি নিজের ছেলেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং নির্দেশ দেন, সবাইকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে। স্থানীয় বাসিন্দারাই তখন নিজেরাই উদ্ধারকাজের দায়িত্ব নেন। কেউ ঘরে আটকে আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গিয়ে সবাইকে বের করে আনা হয়। চিফ জানান, সবচেয়ে স্বস্তির খবর হলো ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে কেউ প্রাণ হারাননি। তবে পুরো বসতি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বাসিন্দারা।
এই বিপর্যয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় এসেছে ১৩ বছর বয়সী কিশোর চ্যান্স পাওভোলা। দাবানলের আগুনের মাঝখানে ছোট্ট টিনের নৌকা চালিয়ে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। চ্যান্স জানান, প্রথমে সবাই ভেবেছিলেন আগুন তাদের গ্রাম এড়িয়ে যাবে। কিন্তু হঠাৎ বাতাসের দিক পরিবর্তন হওয়ায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, “আগুন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছিল। দৃশ্যটা এত ভয়ঙ্কর ছিল যে বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমাদের গ্রাম পুড়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় ভয় ছিল, যদি কেউ পিছনে থেকে যায়।” যেহেতু কলিন্স ফার্স্ট নেশনে কোনো সড়কপথ নেই, তাই বাসিন্দাদের নৌকায় করে হ্রদ পার হয়ে পালাতে হয়। মানুষ যা সম্ভব হয়েছে সঙ্গে নিয়েই নিরাপদ স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। চ্যান্স জানান, পালানোর সময় তিনি নিজের নৌকা ঘুরিয়ে আরেকটি অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকার সাহায্যে এগিয়ে যান। নৌকাটি ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। চিফ হেলেন পাওভোলা বলেন, “আর কয়েক মিনিট দেরি হলে ওই নৌকায় থাকা মানুষগুলো হয়তো বেঁচে ফিরতেন না।”
দাবানলের ভয়াবহতার আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস থেকে আসা দুই পর্যটক ডেভিড ওগল এবং কেভিন স্টোভলের অভিজ্ঞতায়। দুজন ক্যানো নিয়ে প্রকৃতির মাঝে ভ্রমণে ছিলেন। হঠাৎ দূরে ধোঁয়া দেখতে পান। প্রথমে তাঁরা স্থানীয় আউটফিটারকে বিষয়টি জানালে তাঁদের একটি নির্দিষ্ট হ্রদের দিকে যেতে বলা হয়, যেখানে একটি ফ্লোট প্লেন এসে উদ্ধার করার কথা ছিল। কিন্তু আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে মাঝপথেই তাঁদের থেমে যেতে বলা হয়। পরে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারও ধোঁয়ার কারণে নিরাপদে নামতে পারেনি। ফলে প্রায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় তাঁদের খোলা আকাশের নিচে কাটাতে হয়। নিরাপত্তার জন্য তাঁরা পুরো রাত ক্যানোর মধ্যেই ছিলেন, যাতে আগুন কাছে এলে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে নেমে যেতে পারেন। ডেভিড ওগল বলেন, “চারদিকে ছাই উড়ছিল, ধোঁয়া ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছিল। শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। আমরা প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে অস্থায়ী ফিল্টার তৈরি করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করেছি।” পরদিন অবশেষে হেলিকপ্টারে তাঁদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে তাঁদের অধিকাংশ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র, এমনকি পাসপোর্টও আগুনে পুড়ে যায়। যে ওয়াবাকিমি উইল্ডারনেস লজে তাঁরা কিছু মালপত্র রেখে গিয়েছিলেন, সেটিও সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
অন্টারিওর অ্যাভিয়েশন, ফরেস্ট ফায়ার অ্যান্ড ইমার্জেন্সি সার্ভিসেস জানিয়েছে, কলিন্স ফার্স্ট নেশনকে গ্রাস করা দাবানলের আয়তন ইতোমধ্যেই ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরেরও বেশি। উত্তর-পশ্চিম অন্টারিও অঞ্চলে বর্তমানে ১৩৬টি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬৩টি আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। দাবানলের পাশাপাশি প্রবল বাতাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগুন এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় দমকল বাহিনীর কাজও কঠিন হয়ে উঠছে।
এ পর্যন্ত উত্তর অন্টারিওর অন্তত ১৫টি সম্প্রদায় ইতোমধ্যে সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে অথবা সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এসব এলাকার অনেকগুলোই সড়কপথে সংযুক্ত নয়। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে নৌকা কিংবা বিমানই একমাত্র ভরসা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অন্টারিও সরকার কানাডার ফেডারেল সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, প্রয়োজনে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের নোটিশে যেন উদ্ধারকারী বিমান প্রস্তুত রাখা হয়। কারণ বাতাসের গতিপথ বদলালে যে কোনো সময় আরও বড় আকারে গণউচ্ছেদের প্রয়োজন হতে পারে।
উত্তর আমেরিকাজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দাবানলের তীব্রতা ও বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া, অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং প্রবল বাতাস আগুনকে দ্রুত বিস্তারের সুযোগ করে দিচ্ছে। উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
কলিন্স ফার্স্ট নেশনের ঘটনাটি শুধু একটি গ্রামের ধ্বংসের গল্প নয়; এটি দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ কত দ্রুত একটি সম্পূর্ণ জনপদকে মানচিত্র থেকে মুছে দিতে পারে। যদিও স্থানীয় মানুষের সাহস, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে প্রাণহানির মতো বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে, কিন্তু হাজারো মানুষ এখন নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।



