‘কানাডা বেঁচে আছে যুক্তরাষ্ট্রের কারণে’

আলী আহমেদ

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য ঘিরে কূটনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে। বুধবার ডাভোসে বক্তৃতা দেওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কারণেই টিকে আছে।” তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে নিজের বক্তব্য দেওয়ার সময় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির উচিত এই বাস্তবতা স্মরণে রাখা।

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরপরই ভিন্ন সুরে কথা বলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি বলেন, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ভিত্তিতে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। তবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কারণে বেঁচে আছে এই বক্তব্য তিনি স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর লিখিত ভাষণে যা আগেই সাংবাদিকদের কাছে বিতরণ করা হয়েছিল এই প্রতিবাদী লাইনটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল পূর্বপ্রস্তুতিহীন কিন্তু সচেতন এক কূটনৈতিক বার্তা।

কার্নি তার বক্তৃতায় বলেন, “আমরা যখন দয়ালু হই, তখন দয়া বাড়ে; আমরা যখন ঐক্যবদ্ধ হই, তখন একতা শক্তিশালী হয়; আর আমরা যখন কানাডিয়ান অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হই, তখন কানাডা আরও বড় হয়ে ওঠে।” এই বক্তব্যের পরই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার ধারণা নাকচ করেন।

বক্তৃতা শেষে প্রধানমন্ত্রী কার্নি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন নেননি। ফলে তার বক্তব্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যায়। পরে এ বিষয়ে কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেইনের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিশেষ করে আসন্ন বাণিজ্য আলোচনার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর এই প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অদূরদর্শী কি না।

জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “ভাবুন, কানাডা নেতৃত্ব দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এমন অনেক কথা বলেছেন যা মানুষ ভাবতে শুরু করে, আর সেগুলো তিনি সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন।” শ্যাম্পেইনের এই মন্তব্যে স্পষ্ট, সরকার প্রধানের অবস্থানকে সমর্থন দিচ্ছে কানাডার মন্ত্রিসভা।

ডব্লিউইএফের মঞ্চ থেকেই ট্রাম্প কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কানাডা বিনামূল্যে বহু সুবিধা পায়। যদিও তিনি এসব সুবিধার নির্দিষ্ট তালিকা দেননি, তবে তার বক্তব্যে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবার সামনে আসে।

এ সপ্তাহের শুরুতে ডব্লিউইএফে দেওয়া কার্নির আরেকটি বক্তৃতার সঙ্গেও বৃহস্পতিবারের বক্তব্যের মিল রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত। সেই বক্তৃতায় তিনি বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভাঙন, বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক ভয়কে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা এবং এর মুখে মধ্য শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

ডাভোসের এই বাক্‌বিনিময় শুধু ব্যক্তিগত মতবিরোধ নয়, বরং উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ মিত্রের সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনকেই তুলে ধরেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনমূলক বক্তব্য, অন্যদিকে কানাডার সার্বভৌম অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরা এই দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক আলোচনায় কী প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Articles

Back to top button