কার্নির পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা

মাহবুবুল আলম

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্ক কার্নি কানাডার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে বাণিজ্য ও নিরাপত্তাকে সামনে এনেছেন।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্ক কার্নি কানাডার পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে বাণিজ্য ও নিরাপত্তাকে সামনে এনেছেন। লিবারেল সরকার জোর দিয়ে বলছে, এই কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অর্থ মানবাধিকার থেকে সরে আসা নয়। বরং বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থনৈতিক স্থিতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কানাডা এখনো আন্তর্জাতিক পরিসরে মানবাধিকারের পক্ষে সোচ্চার থাকবে। তবে এই অগ্রাধিকার পরিবর্তন ইতোমধ্যেই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বিশেষ করে অধিকারকর্মী ও সাবেক কূটনীতিকদের মধ্যে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পররাষ্ট্রনীতি চীন, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে কানাডার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই এর মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও গভীর করার কথা বলা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কানাডার কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে যেখানে ঐতিহ্যগত মানবাধিকার কূটনীতির পাশাপাশি বাণিজ্যিক আলোচনা, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর বাড়ানো হচ্ছে।

ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার অধ্যাপক ও বৈদেশিক অনুদান গবেষক স্টিফেন ব্রাউন মনে করেন, সরকার প্রকাশ্যে কখনোই বলবে না যে তারা মূল্যবোধের প্রতি কম আগ্রহী। তবে তার ভাষায়, “স্পষ্টতই অগ্রাধিকারের জায়গায় একটি পরিবর্তন এসেছে।” ব্রাউনের মতে, নীতিগত অবস্থান আর বাস্তব কৌশলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কানাডার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্নির সাম্প্রতিক বক্তব্য। গত মাসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, কানাডা আর নিজেকে “নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি”-র কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছে না। তবে একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার সরকার এখনো মূল্যবোধকে ধারণ করে। এর মধ্যে বিদেশে এলজিবিটিকিউ+ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, নারীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সমতা-ভিত্তিক নীতির পক্ষে থাকা অন্তর্ভুক্ত।

জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত জি২০ সম্মেলনের ফাঁকে কার্নি আরও স্পষ্ট করে বলেন, “হ্যাঁ, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এই দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু আমি একে শুধুমাত্র নারীবাদী পররাষ্ট্রনীতি বলে আখ্যায়িত করতে রাজি নই।” পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বক্তব্য মূলত সরকারকে আরও কৌশলগত স্বাধীনতা দিতে চাওয়ার ইঙ্গিত যাতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আদর্শিক লেবেল বহন করতে না হয়।

তবে এই অবস্থান মানবাধিকারকর্মীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সুদানে চলমান জাতিগত সহিংসতায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্নি সরকার দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে, যা কানাডার ঘোষিত মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সমালোচনার তালিকায় যোগ দিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লয়েড অ্যাক্সওর্দি। তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্নির বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের “পদলেহন নীতি” অনুসরণের অভিযোগ তুলেছেন অর্থাৎ বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় নীতিগত প্রশ্নে আপস করার প্রবণতা। অ্যাক্সওর্দির মতে, এতে কানাডার স্বতন্ত্র ও নৈতিক কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।

এছাড়া নভেম্বরে ঘোষিত বাজেটেও বিতর্কের রেশ রয়েছে। সেখানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য উদ্যোগে তহবিল কমিয়ে আনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এতদিন এই খাতে কানাডার অবদান সমপর্যায়ের অর্থনীতিগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। স্টিফেন ব্রাউন মনে করেন, “আমরা ধীরে ধীরে নেতা হয়ে উঠছিলাম। এখন মনে হচ্ছে, আমরা আর সেই নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে চাই না।”

সব মিলিয়ে, মার্ক কার্নির নেতৃত্বে কানাডার পররাষ্ট্রনীতি একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার যেখানে একে বাস্তববাদী ও সময়োপযোগী সমন্বয় হিসেবে দেখছে, সমালোচকেরা সেখানে নৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করছেন। আগামী দিনে এই নতুন কৌশল কানাডার বৈশ্বিক ভূমিকা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে সেদিকেই এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর।

Related Articles

Back to top button